ফাইতং ৩ ইটভাটায় ৬ লাখ টাকা জরিমানা জব্দের পরও থামছে না পরিবেশ ধ্বংস

 

মো. সেলিম উদ্দিন খাঁন

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করিয়া তিনটি লাইসেন্সবিহীন ইটভাটাকে মোট ৬ (ছয়) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান এবং প্রায় ৩ (তিন) শত ঘনফুট জ্বালানি কাঠ জব্দ করিয়াছে উপজেলা প্রশাসন।

 

তথাপি প্রশ্ন রহিয়াছে, এই সাময়িক ব্যবস্থা কি পরিবেশ ধ্বংসের স্থায়ী প্রতিকার দিতে সক্ষম হইবে? ৪ এপ্রিল শনিবার বিকেলে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মঈন উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত উক্ত যৌথ অভিযানে সহযোগিতা প্রদান করেন লামা বন বিভাগের ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বনকর্মীগণ, পুলিশ বাহিনী এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যবৃন্দ।

 

অভিযানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। প্রত্যেকটি ইটভাটাকে ২ (দুই) লক্ষ টাকা করিয়া জরিমানা আরোপ করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফাইতং ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরিয়া প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় একাধিক অবৈধ ইটভাটা পরিচালিত হইয়া আসিতেছে।

 

এসব ইটভাটায় নির্বিচারে বনাঞ্চলের কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হইতেছে, যাহা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, সব মিলাইয়া এই জনপদে পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, “বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে আর কত পরিবেশ ধ্বংস চলিলে এই অবৈধ ইটভাটাগুলি বন্ধ হইবে?”এই প্রশ্ন আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মুখে মুখে উচ্চারিত হইতেছে। জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ জানান, লোকবল সংকট এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হইতেছে না।

 

তবে সাধারণ জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে সংশয় দেখা দিয়াছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলিতেছেন, ইহা কি কেবল অজুহাত, না কি বাস্তবতার অন্তরালে অন্য কোনো প্রভাবশালী শক্তির অস্তিত্ব রহিয়াছে? অভিযোগ রহিয়াছে, অবৈধ ইটভাটাগুলি রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত হইতেছে।

 

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটিলেও ইটভাটার কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় নাই; বরং মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে কার্যক্রম অব্যাহত রহিয়াছে। অতীতে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হইলেও প্রত্যেক ক্ষেত্রেই বাধার সম্মুখীন হইতে হয়। ইটভাটা মালিকগণ সাধারণ শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করিয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মুখে প্রতিরোধ গড়িয়া তোলে।

 

ফলে সম্ভাব্য সংঘর্ষ ও জানমালের ক্ষতির আশঙ্কায় প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যতিরেকে ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইতে হয়। উল্লেখযোগ্য যে, প্রশাসন কর্তৃক আরোপিত অর্থদণ্ড অনেক ক্ষেত্রে ইটভাটা মালিকদের নিকট বৈধতার ন্যায় বিবেচিত হইতেছে। ফলে জরিমানার পরও কার্যক্রম বন্ধ না হইয়া পূর্বের ন্যায় চলিয়া যাইতেছে।

 

পরিবেশ রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের এই সীমাবদ্ধতা ফাইতং ইউনিয়নের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে চরম ঝুঁকির সম্মুখীন করিতেছে। পাহাড় নিধন ও বন উজাড়ের এই অব্যাহত ধারা বন্ধ করিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতার সমন্বিত প্রয়াস এখন সময়ের একান্ত দাবি।বাংলাদেশ একটা সবুজ ব-দ্বীপ। প্রকৃতির অপরূপ রূপে সজ্জিত এ ব-দ্বীপ। এখানে রয়েছে নদ-নদী, দিগন্ত জোড়া মাঠ, সবুজ বন-বনানী, পাহাড়, উপত্যকা, প্রাকৃতিক সম্পদ ইত্যাদি। এ সবের সমন্বয়ে দেশটির সমৃদ্ধি পৃথিবীব্যাপী ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। সে কারণেই বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও শাসকরা বিভিন্ন সময়ে এ দেশে আক্রমণ করেছে।

 

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পাহাড়ি এলাকাও অত্যন্ত সমৃদ্ধ; কিন্তু অসংখ্য ইটের ভাটা পাহাড়ি এলাকার পরিবেশকে অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করার সুবাদে এরূপ ইটের ভাটা ও তাদের কিছু কার্যক্রম দৃষ্টিগোচর হয়। যা হৃদয় ও মনকে প্রতিনিয়ত আহত করে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.