জামায়াতের এমপি শাহজাহান চৌধুরীর পিএসের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা
গভীর রাতে মুঠোফোনে কল করে ২০লাখ টাকা দাবীর অভিযোগ -
ঢাকা পোষ্ট –
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আরমান উদ্দিন ও তার ভাই আরিফ উদ্দিনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে চাঁদাবাজি মামলা হয়েছে। রোববার (২৩ আগস্ট) চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে লোহাগাড়ার পশ্চিম কলাউজান এলাকার বাসিন্দা আমির হোসেন মামলাটি করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আদনান কবির জিলান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে নিকটস্থ সার্কেল অফিসারকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ হিসেবে সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মামলাটি তদন্ত করবেন।
মামলায় আরমান উদ্দিনের পাশাপাশি তার ভাই আরিফ উদ্দিন (৩৭), লোহাগাড়ার শওকত আলী (৪২), আদিল (৩২), আনোয়ার (২৮) ও জয়নাল আবেদীন (৩৩)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকেও আসামি করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, বাদীর লোহাগাড়ার আজিজ কমপ্লেক্সে চারতলা একটি ভবন রয়েছে। ২০০৬-২০০৭ সালের দিকে নিজের কেনা জমিতে ভবনটি নির্মাণ করেন তিনি। ভবনের নিচতলায় একটি আলমারির দোকান এবং অন্য অংশে বসতঘর ভাড়া দেওয়া হয়। কিছুদিন ধরে আরমান উদ্দিনের নেতৃত্বে তার ভাই আরিফ উদ্দিন বাদীর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা না দিলে ঘর ও মার্কেট দখল করে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ভিন্ন এলাকা থেকে এসে তাদের এলাকায় বসবাস করার কারণেও চাঁদা দিতে হবে বলে আসামিরা জানান।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ এপ্রিল রাত আনুমানিক দুইটার দিকে আরমান উদ্দিন মোবাইল ফোনে বাদীর কাছে আবারও চাঁদা দাবি করেন। বাদী টাকা দিতে পারবেন না জানালে তার ঘর দখল করে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এরপর ওই রাতেই আসামিরা আজিজ কমপ্লেক্সের নিচতলায় বাদীর ভাড়াটিয়া ওবায়দুলের আলমারির দোকানের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ওইসময় দোকান থেকে ১২টি তিন-পাটের স্টিলের আলমারি, তিনটি দুই-পার্টের আলমারি, দুটি দুই দরজার আলমারি, ছয়টি চার দরজার ওয়াল শোকেস, দুটি দুই পাশের দরজার ওয়াল শোকেস, আলমারি শিটসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়।
এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৯ টাকা। এ ছাড়া দোকানের একটি ক্যাশ টেবিল, যার ভেতরে নগদ এক লাখ ২০ হাজার টাকা ছিল, সেটিও নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে দোকানে নতুন তালা লাগিয়ে দেন আসামিরা।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ভবনের ওপরের তলার ভাড়াটিয়াদের কাছে গিয়ে ভবিষ্যতে যেন বাসা তাদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়, সে কথাও বলেন আসামিরা। ঘটনার সময় বাদী প্রবাসে ছিলেন। দেশে ফিরে তিনি বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে বসেন। পরে গত ২০ আগস্ট সকাল আনুমানিক নয়টার দিকে বৈঠকের কথা বলে আসামিরা বাদীর ভবনে বসেন। সেখানে আরিফ উদ্দিন আবারও ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং টাকা না দিলে দোকান ও ঘরের দখল ছেড়ে দেবেন না বলে জানান বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আরমান উদ্দিন মোবাইল ফোনে বাদীকে বলেন, তার এলাকায় বসবাস করতে হলে তাদের কথামতো চলতে হবে। আসামি আদিল চাঁদা না দিলে বাদীকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে আরিফ উদ্দিন, শওকত আলী, আরমান উদ্দিন ও আদিল বাদীকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান বাদী।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় ঘটনার পর বাদী লোহাগাড়া থানায় গিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। পুলিশ মামলা নেওয়ার কথা বলে ঘটনাস্থলেও যায়। পরে মামলা গ্রহণ না করায় তিনি আদালতে মামলা করতে বাধ্য হন।
বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করায় মামলার বিষয়ে আরমান উদ্দিনের কাছে থেকে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আরমান উদ্দিন জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের সমন্বয় করেন। এর সুবাদে প্রশাসনে প্রভাব বাড়ে আরমানের। ওই বছরের আগস্টের শেষের দিকে লোহাগাড়ার ব্যবসায়ী খোরশেদ আলমকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে মারধর এবং মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে আরমান উদ্দিনের বিরুদ্ধে। পরে চট্টগ্রাম নগরে সংবাদ সম্মেলন করেন ওই ব্যবসায়ী। গত মে মাসে টংকাবতী খাল খননের নামে বালি উত্তোলনের সুযোগ করে দিতে স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর কাছ থেকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বরাবর একটি ডিও লেটার ম্যানেজ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে আরমান উদ্দিনের বিরুদ্ধে। গত ১৮ আগস্ট আরমান উদ্দিনের একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। ওই কথোপকথনে বালু ব্যবসা চালু রাখতে স্থানীয় থানা, উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে বালু ব্যবসা আরও বিস্তৃত করতে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে পজিটিভ সেটেলমেন্ট বা সমঝোতার কথাও ওই ফোনালাপে ওঠে আসে।
একই ফোনালাপে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীকে লোহাগাড়ায় এলে পায়ে গুলি করার হুমকির কথাও ওঠে আসে। এ সময় আরমান উদ্দিন ওই হুমকির প্রতিবাদ না করে সংসদ সদস্যকে এলাকায় আসতে নিষেধ করার ইঙ্গিত দেন এবং নিজেকে এলাকার নিয়ন্ত্রক হিসেবে উপস্থাপন করেন।