সাতকানিয়া ছাড়তে হচ্ছে ইউএনওদের, কম সময়ে চারজনের বদলি

দুবছর আগে ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শহীদ মিনারে জুতো পায়ে উঠে বিতর্কের মুখে পড়েন সাতকানিয়ার তৎকালীন ইউএনও মোহাম্মদ মোবারক হোসেন। পরের বছরের ১৪ জানুয়ারি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা প্রণব ধরের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা না দিয়ে আবারো তোপের মুখে পড়েন তিনি। এই দুই কাণ্ড মাথায় নিয়ে ওই বছরের ২৬ জানুয়ারি সাতকানিয়া ছাড়তে হয় তাকে।

একইদিনে তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে যোগদান করেন মোহাম্মদ নূর-এ-আলম। বিতর্ক পিছু ছাড়েনি তাকেও। উপজেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় অর্ভথ্যনা না জানানো নিয়ে স্থানীয় এমপি আবু রেজা মুহম্মদ নেজামউদ্দীন নদভীর তোপের মুখে পড়েন তিনি। সেই ঘটনার এক ২১ দিন পর তাকেও সরিয়ে নেওয়া হয় সাতকানিয়া থেকে। বদলি করা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়াতে।

এরপর নতুন ইউএনও হিসেবে আনা হয় মো. আব্দুস সালাম চৌধুরীকে। তিনি কোন বিতর্কের সৃষ্টি না করলেও আট মাসের মাথায় তিনি বদলি হন। যদিও তিনি পদোন্নতি দিয়ে তাকে পদায়ন করা হয় বিজি প্রেসে। তার স্থলে প্রথমে হবিগঞ্জ থেকে  বৈশাখী বড়ুয়াকে পদায়ন করা হলেও বাতিল করা হয় সেই আদেশ। বাতিলের ১৫ দিন পরেই নতুন আদেশে বর্তমান ইউএনও মো. নজরুল ইসলামকে পদায়ন করা হয়।

প্রায় চার মাসের মাথায় ব্যক্তিগত চেম্বারে যাওয়ার পথে ডা. ফরহাদ কবির নামে এক চিকিৎসকে দণ্ডবিধির ২৭০, ২৭১ ধারায় এক হাজার টাকায় জরিমানা করে বিতর্কের মুখে পড়েন ইউএনও নজরুল ইসলাম। ডা. ফরহাদ কবির নামে ওই চিকিৎসককে তিনি জেল দেওয়ার হুংকার ছাড়াও চিকিৎসক সমাজ নিয়ে অশোভন কথাবার্তা বলেন।

এনিয়ে স্বাচিপের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আ.ম.ম মিনহাজুর রহমান তার শাস্তির দাবি জানিয়ে অভিযোগ করেন জেলা সিভিল সার্জন ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। এ ঘটনার একদিন পরেই রবিবার বিকেলে তাকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে নেওয়ার আদেশ জারি হয়।

চট্টগ্রামের শুধুমাত্র একটি উপজেলাতেই ঘন ঘন ইউএনও বদলিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক কোন্দলে পড়ে ইতোপূর্বের ইউএনওদের বদলি হয়েছে ধারণা করলেও এবারের বদলিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। চিকিৎসকে পথ আটকে জরিমানা, জেলে পাঠানোর হুমকি, অশোভন আচরণে ফুঁসে উঠেছেন তারা। এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নানা ধরনের মন্তব্য করেছেন।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাতকানিয়ার বাসিন্দা ডা. আ.ম.ম মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা না দেওয়াসহ নানা বিতর্কে বদলি করা হয়েছিল মোবারক হোসেনকে। তবে নূরে আলম সাহেব কোভিডের প্রথম দিকে মাঠে নেমে কাজ করেছেন। আমরা ওনার ওই কাজকে এপ্রিশিয়েট করি। পরবর্তীতে ওনাকে হঠাৎ করে বদলি করা হলো। বৈশাখী বড়ুয়া নামে একজনকে দেয়া হলো তাকেও সরিয়ে নেওয়া হলো। মাঝখানে একজন আসছিলো তিনি কিন্তু ভালো কাজ করছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘প্রশাসনিক বদলিগুলোতো কিছু রুটিন ওয়ার্ক, আবার কিছু আছে প্রশাসনিক কিছু সিদ্ধান্ত তারা বদল করেন। এই বিষয়টা আমাদের বলার কিছু নেই। তবে আমরা মনে করি যে প্রশাসনকে স্থিতিশীল রাখতে কর্মকর্তাদের সময় দেওয়া প্রয়োজন। আবার যার উপস্থিতির কারণে বা যিনি প্রশাসন চালাতে গিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি করেন তাকেও আর রাখা যায়না। আমি মনে করি যে একজন ইউএনও তারা বিসিএস ক্যাডার। ওনি এখানে আসার পরে একটা দীর্ঘ সময় দিলে ওনি প্রশাসনকে ভালোভাবে চালাতে পারলে এটা জনগণের জন্যও সুবিধা হয়। আবার উপজেলা প্রশাসনের জন্যও সুবিধা হয়। কারণ ১৭টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা নিয়ে উপজেলা। সুতরাং এটি একটি বড় উপজেলা। উপজেলায় কাজ করার সময় দিতে হবে, সুযোগ দিতে হবে।’

স্থানীয়দের ধারণা ঘন ঘন ইউএনও বদলি স্থানীয় এমপির সঙ্গে রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে হয়ে থাকে বিষয়টি আসলে কতটুকু এমন প্রশ্নের জবাবে সাতকানিয়ার আওয়ামী রাজনীতির একটা অংশের নিয়ন্ত্রক ডা. আ.ম.ম মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘সাতকানিয়ায় যখন নতুন নতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা ওসি আসে তখনই তাদের সঙ্গে ভালোভাবে মিলেমিশে চলেন এমপি। আবার ছয়মাসের মধ্যেই তাদের সঙ্গে বৈরি সম্পর্ক তৈরি হয় বিভিন্ন কারণে। এগুলো আমরা গত সাত বছর ধরে দেখছি। গত সাত বছর ধরেই আমরা দেখছি ওনি পছন্দ করে ইউএনও কিংবা ওসি নিয়ে আসেন, কিছুদিন ওনার পছন্দ থাকে। এরপর আবার ছয়মাসের মধ্যেই তাদের বদলির চেষ্টা করেন তিনি। এটা হলো ওনার ব্যক্তিগত ইগো কিংবা বিষয়। এটা নিয়ে আমাদের সমালোচনা করার কিছু নেই। ওনি ওনার দৃষ্টিকোণ থেকে করেছেন।’

‘আপনি মনে করেন এখানে অন্য কোন রাজনৈতিক বিষয় নেই। যেমন ধরেন আমাদের উপজেলা চেয়ারম্যান একজন সজ্জন লোক। আর ধরেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আছেন ওনি এ সমস্ত বিষয়ে কোন নাকই গলান না। প্রশাসনিক রদবদল কিংবা কে আসবে যাবে এগুলো নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। তাহলে আর কে মাথা ঘামাবে? আর মাথা ঘামিয়ে কিছু করার জন্য এমপি সাহেব ছাড়া আর কেউ নাই।’ যোগ করেন এ স্বাচিপ নেতা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান বলেন, ‘ওই এলাকার বেশিরভাগ বদলি মিনিস্ট্রি থেকে করা হয়েছে। সেখানে আমার করার কিছু নেই। সরকারি চাকরি যেহেতু আমরা বদলির বিষয়টাকে খুব ইজিলি দেখি। তাই এসব বদলি নিয়ে মাঠ প্রশাসনে তেমন প্রভাব পড়বে বলে মনে হয়না।’

হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে আগত ফাতেমা তুজ জোহরা ই কি তাহলে সাতকানিয়ার নতুন ইউএনও হচ্ছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এখনো সেই সিদ্ধান্ত হয়নি। তা চূড়ান্ত করার জন্য আমাদের একটি কমিটি আছে। আমরা বসে সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে তারপর সাতকানিয়ায় নতুন ইউএনও পদায়ন করব। সূত্র: সিভয়েস।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.