আ ন ম সেলিম , পটিয়া (চট্টগ্রাম):
অবশেষে আলোর পথে পটিয়া পৌরসভার ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন কাজ। পৌরসভার ডাম্পিং স্টেশনের জায়গা ক্রয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের একমাত্র প্রথম শ্রেনীর পৌরসভার পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষের আবর্জনা ফেলার নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশনের জন্য জায়গা ক্রয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়।
৩১ জানুয়ারী উক্ত মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. আব্দুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা গেছে। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে Dumping Station/Sanitary Landfill তৈরির জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণের শর্তে পটিয়া পৌরসভার সুচক্রদন্ডী মৌজার ৩৪৫০ নং খতিয়ানের ৬ টি দাগে মোট ৮১ শতক ভূমি ক্রয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন নির্দেশক্রমে প্রদান করা হলো।
এদিকে, প্রতিষ্ঠার ২৩ বছর পর ডাম্পিং স্টেশনের জন্য জায়গা ক্রয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়ায় খুশি পৌরবাসীরা। তারা বলছেন, এতো বছর পটিয়া পৌরসভার নির্ধারিত কোন ডাম্পিং স্টেশন ছিলনা। বিক্ষিপ্ত ভাবে সড়ক মহাসড়কের পাশে পৌরবাসীর শত শত টন বর্জ্য ফেলে রাখা হতো। এতে পৌরসভার বাসিন্দারা সহ পটিয়া চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কে চলাচলরত যানবাহন আর মানুষের মাঝে দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো। পৌর মেয়র আইয়ুব বাবুল মেয়র হওয়ার পর থেকেই একটি নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশন স্হাপন করার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। অবশেষে মেয়রের সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে পরিনত হওয়ার ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। আমরা আশা করছি খুব শীগ্রই ময়লা পরিশোধনের ডাম্পিং স্টেশনের জন্য নির্ধারিত স্থানটির ক্রয় কাজ শেষ করে বাস্তবে রূপ লাভ করবে।
অন্যদিকে, পৌরসভার আওতাধীন একাধিক সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও ময়লার ভাগারে পরিণত হয়েছে পৌর শহরের খাল, সড়ক মহাসড়কসহ একাধিক স্পট। নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলায় বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় বসবাসকারীদের দুর্গন্ধ এখনো নিত্যসঙ্গী।
পৌরশহরকে বেষ্টনকারী কয়েকটি খাল এখন ময়লার ভারে বেশিরভাগ স্থান দিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও এসব খালে বর্জ্য ফেলায় পানি দূষিত হচ্ছে। দূষিত হলেও পৌর শহরে বাস করা অনেকে গোসলসহ গৃহস্থালী কাজে ওই পানি ব্যবহার করছেন। এমনকি হাসপাতালে রোগীদের ব্যবহৃত বিষাক্ত ময়লাও ফেলা হয় উন্মুক্ত স্থানে। নির্দিষ্ট স্থান এবং অপরিকল্পিতভাবে ময়লা-আবর্জনা ফেলায় পৌর শহরের স্বাভাবিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য নষ্ট হতে যাচ্ছে। ময়লায় বেওয়ারিশ কুকুর, বিড়াল এবং গবাদি পশুদের বিচরণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দুর্গন্ধে পরিণত হচ্ছে। দুর্গন্ধের পাশাপাশি ওই স্থান থেকে রোগ-জীবাণু ছড়াচ্ছে। এ নিয়ে পৌরবাসীর ক্ষোভ থাকলেও পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি তারা জমির অভাবে ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন করতে পারেননি।
সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০ সালের ৯ এপ্রিল স্থাপিত হওয়ার একবছরে মাথায় পটিয়া পৌরসভা প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়। প্রায় ১০.৩৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভায় অর্ধ লাখের অধিক মানুষের বসবাস। নাগরিক সুবিধার জন্য রয়েছে ৫টি হাটবাজার, ১টি কসাইখানা, ২০.৩৮ কিলোমিটার, পাকা-কাঁচা রাস্তা ০৮.২০ কিলোমিটার, ইট বিছানা রাস্তা ৬৪.২৬ কিলোমিটার, ১টি রেল স্টেশন, ১৩৯০টি সড়কবাতি,৪১০ টি নলকূপ, হোল্ডিং সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার, কালর্ভাট ৩০, মহাবিদ্যালয় ২, মাধ্যমিক বিদ্যালয় (বালক) ২, মাধ্যমিক বিদ্যালয় (বালিকা) ২, মাধ্যমিক বিদ্যালয় যৌথ ১, প্রথমিক বিদ্যালয় ১০, আলিয়া মাদ্রাসা ২, দাখিল মাদ্রাসা ৩, পিটিআই ১, কিন্ডারগার্টেন ১৪, ওয়ার্ড ৯টি, স্বাক্ষরতার হার ৬৮.৪৮%, সড়কবাতি ১৩৯০টি, পাবলিক টয়লেট ২, ফায়ার সার্ভিস ১, সরকারি হাসপাতাল ১, বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক ৪, পশু হাসপাতাল ১, মসজিদ ৬৫, মন্দির ১৫, গীর্জা ১, প্যাগোডা ১, বাস স্টেশন ১, লবন মিল ৪১, রাইচ মিল ৩, বিসিক শিল্প নগরী ১, সাবজজ আদালত ১, ডাকবাংলো ১, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ১, বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ ১, খাদ্য গুদাম ১ ব্যাংক ১৫, হাটবাজার ৫ টি।
পৌর শহরের কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী ফারুক রেজভি বলেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন বর্জ্যের দুর্গন্ধে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এবার যদি সরকারের জায়গা ক্রয়ের অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে মুক্তি মিলবে।
পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও স্কুল-মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র শাহরিয়ার ওমর, নাজিম উদ্দীন,জান্নাতুল ফেরদৌস খানম,রবিউল ইসলাম বলেন, সড়কের পাশে আবর্জনা ফেলে রাখার কারনে আমরা ওই ময়লার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় নাকে কাপড় পেঁচিয়ে কোনোরকমে এলাকা পার হতে হয় আমাদের। শুনেছি সরকারি ভাবে ৮১ শতাংশ জায়গা কেনার জন্য প্রশাসনিক ভাবে অনুমোদন বাস্তবে রূপ দিতে পারে তাহলে পৌরবাসীর দূর্ভোগ লাগব হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সব্যসাচী নাথ বলেন, বর্জ্য-আবর্জনাযুক্ত পানি ব্যবহারে মানুষের রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ ছাড়া উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য থেকেও একই রকম ঝুঁকি থাকে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কল্পনা রহমান বলেন,পরিচ্ছন্ন পরিবেশবান্ধব পৌরসভার জন্য ডাম্পিং জোন প্রয়োজন। এ ছাড়াও পৌর কর্তৃপক্ষ তাদের ময়লা-আবর্জনাকে সম্পদে পরিণত করতে পারে। তাদের সংগৃহীত বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও জৈবসার উৎপাদন করা সম্ভব। আমি আশা করছি ডাম্পিং স্টেশনের জন্য যেহেতু সরকার জায়গা ক্রয়ের অনুমোদন দিয়েছে, সেহেতু পৌর কতৃপক্ষ বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও জৈব সার উৎপাদনে বিশেষ ব্যাবস্থা নিবে। বর্জ্য দুই ধরনের। একটি তরল ও অপরটি শক্ত। শক্ত বর্জ্য থেকে পলিথিন যাতে না আসে, অথবা পলিথিন পাওয়া গেলে তা বের করে পুনঃপ্রক্রিয়া করণের (রি-সাইকেলিং) মাধ্যমে তরল ও শক্ত বর্জ্য সংরক্ষণ করে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় উন্নতমানের জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। এতে ফসলি জমির উর্বরতা বাড়বে।
পৌর মেয়র মো. আইয়ুব বাবুল বলেন, পৌর শহরের পরিবেশ ও পরিচ্ছন্ন রাখতে ডাম্পিং স্টেশনের অভাব দীর্ঘ দিনের।