উখিয়া উপজেলা জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য বিএনপি নেতা আরফাতের নেতৃত্বে ১২২ বস্তা মাছ লুট
১০০ বস্তা ফেরত, বাকি ২২ বস্তা নিয়ে ধোঁয়াশা
সৈয়দ আককাস উদদীন, চট্টগ্রাম থেকে
উখিয়া উপজেলা বিএনপির বিতর্কিত নেতা আরফাত চৌধুরীর বিরুদ্ধে এবার এক ব্যবসায়ীর ১২২ বস্তা মাছ লুটের অভিযোগ উঠেছে।
কক্সবাজার–টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের সোনারপাড়া পয়েন্ট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর আরফাতের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট পুরো মাছ আত্মসাৎ করতে না পেরে স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতা ও প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তির হস্তক্ষেপে ১০০ বস্তা মাছ ফেরত দেয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, মাছ ফেরতের বিনিময়ে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে লেবার খরচ বাবদ ২ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। বাকি ২২ বস্তা মাছ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা দেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, মাছ ফেরত চাওয়ায় তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর তাকে জিম্মি করে আরফাত ও তার সহযোগীরা নিজেদের পক্ষে বক্তব্য দিতে বাধ্য করেছে।
বর্তমানে মাছ লুটের ঘটনাটি উখিয়া উপজেলায় ‘টক অব দ্য টাউন’ এ পরিণত হয়েছে। ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে আরফাতের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত উখিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সোলতান মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি বিষয়টি শুনেছেন এবং লুট হওয়া মাছ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
নানা অভিযোগে জর্জরিত আরফাত চৌধুরীর ব্যাপারে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে উখিয়ায় এক ধরনের আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছেন আরফাত চৌধুরী।
তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, পাহাড় কাটা, চাঁদাবাজি, জমি দখল, থানায় দালালি, মামলা বাণিজ্য, ভূমি অফিস ও ইউএনও কার্যালয়সহ পরিবহন সেক্টরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি কখনো কলেজ শিক্ষক, কখনো সাংবাদিক, কখনো শ্রমিক নেতা, আবার কখনো যুবদল নেতা পরিচয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। বর্তমানে তিনি উখিয়া উপজেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘ডাম্পার আরফাত’ নামেও পরিচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সমুদ্রপথে মিয়ানমারে নিষিদ্ধ পণ্য পাচার করে বিনিময়ে ইয়াবা দেশে আনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। গত এক বছরে তিনি গাড়ি-বাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।
এ ছাড়া বন বিভাগের জমিতে অবৈধ পাহাড় কাটার সময় বনকর্মীদের ওপর হামলার একাধিক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ইনানী পুলিশ ফাঁড়ি থেকে জব্দ করা ডাম্পার ও মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাতেও তার নাম উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও বিতর্কিত শিক্ষক নিয়োগ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আরফাত চৌধুরী উখিয়া উপজেলা যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক এবং জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ছবি ও তথ্যে দেখা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে তিনি উখিয়া ডিগ্রি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছেন, যা নিয়েও তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক নিবন্ধন ছাড়াই এবং অপ্রতুল শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক তদবিরে তিনি নিয়োগ পেয়েছেন।
কলেজের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একজন বিতর্কিত ব্যক্তি ও একাধিক মামলার আসামিকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া শিক্ষাঙ্গনের জন্য অশনিসংকেত।
এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এমন একজন অযোগ্য ও বিতর্কিত মানুষ যদি শিক্ষক হন, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, নিজের কর্মকাণ্ড আড়াল করতে আরফাত চৌধুরী সম্প্রতি সাংবাদিক পরিচয়ও ব্যবহার করছেন এবং বিভিন্ন দপ্তর ও আদালতে সে পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে উখিয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে আরফাত চৌধুরীর সাথে এতাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।