চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা সাতকানিয়া। যেখানে নির্মাণখাতের বড় অংশ নির্ভরশীল স্থানীয় ইটভাটার ওপর। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কাঁচামালের সংকট, প্রশাসনিক কড়াকড়ি, পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি—এই বহুমাত্রিক সমস্যায় ভুগছে এখানকার ইটভাটা শিল্প। এক সময় যেসব ভাটা মৌসুমজুড়ে উৎপাদনে ব্যস্ত থাকত, এখন তার অনেকগুলোই আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে।
ভাটা মালিকদের দাবি, মাটি সংগ্রহে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং প্রশাসনিক অভিযানের কারণে কাঁচামাল জোগাড় করা কঠিন হয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, পরিবেশ রক্ষা ও কৃষিজমি সংরক্ষণে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক উৎপাদনে সরকার উৎসাহ দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এই শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাতকানিয়া উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে ইট উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ইটভাটা। স্থানীয় নির্মাণ কাজ, আবাসন, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসব ভাটার উৎপাদিত ইটই প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও মৌসুমভিত্তিক ৭০টির বেশি ভাটা সক্রিয় ছিল। এসব ভাটায় মৌসুমে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করতেন, যা এলাকার নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বড় কর্মসংস্থানের উৎস ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র বদলে গেছে। অনেক ভাটা বন্ধ, অনেকগুলো সীমিত উৎপাদনে চলছে।
ইট তৈরির মূল উপাদান হচ্ছে মাটি। সাতকানিয়ায় ইটভাটার কাঁচামাল সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এই মাটি সংগ্রহে কড়াকড়ি। কৃষিজমির টপসয়েল কাটার ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে—এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসন নজরদারি বাড়িয়েছে।
ভাটা মালিকদের ভাষ্য, আগে স্থানীয় জমি থেকে নির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে মাটি সংগ্রহ করা যেত। কিন্তু এখন আইনগত জটিলতা এবং প্রশাসনিক তদারকির কারণে সেই প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে গেছে। ফলে ভরা মৌসুম চললেও পর্যাপ্ত কাঁচামাল জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না।
সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ফরিদুল আলম বলেন, ইটভাটার প্রধান উপাদান মাটি। কিন্তু এখন মাটি কাটায় কড়াকড়ি এত বেশি যে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না। মাটি না থাকলে ভাটা চালানোই অসম্ভব।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃষিজমির উর্বর মাটি নির্বিচারে কাটার ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাই আইন অনুযায়ী ভাটা পরিচালনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
কাঁচামালের সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয়ও ভাটা মালিকদের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইট পোড়াতে ব্যবহৃত কয়লার দাম কয়েক দফা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থানীয় ভাটা মালিকরা জানান, আগে যে দামে কয়লা পাওয়া যেত এখন তার চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আবার কখনও সরবরাহ সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে কয়লা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি নেজাম উদ্দিন বলেন, কয়লার দাম বেড়েছে, পরিবহন খরচ বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে—সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু ইটের দাম বাড়ালে ক্রেতারা ক্ষুব্ধ হয়।
অন্যদিকে, ইটভাটাগুলোতে মৌসুমভিত্তিক শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা বেশি। আগে বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক এসে মৌসুমজুড়ে কাজ করতেন। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের কাজের নিশ্চয়তা কমে গেছে। ফলে অনেক শ্রমিক অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
ভাটা মালিকদের মতে, শ্রমিকরা এখন স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা চায়। কিন্তু কাঁচামালের সংকটে আমরা নিয়মিত উৎপাদন করতে পারছি না। তাই শ্রমিক ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে বাজারে ইটের সরবরাহ কমেছে। এতে নির্মাণ খাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। স্থানীয় ঠিকাদার ও নির্মাণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইটের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণ প্রকল্পের বাজেটও বাড়াতে হচ্ছে।
একজন ঠিকাদার বলেন, আগে মৌসুমে সহজে ইট পাওয়া যেত। এখন সরবরাহ কমে গেছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে সমস্যা হচ্ছে।
ইটভাটা শিল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশগত উদ্বেগ রয়েছে। ভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়ায়, আবার মাটি কাটার ফলে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে প্রশাসন ও পরিবেশবিদরা এই শিল্পকে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে ভাটা মালিকদের যুক্তি, ইটভাটা বন্ধ হলে নির্মাণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। তাই একেবারে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে সমন্বিত নীতি নেওয়া দরকার।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক বা পরিবেশবান্ধব ব্লক ব্যবহারে জোর দিচ্ছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ধীরে ধীরে ব্লক ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্লক ব্যবহারে কৃষিজমির মাটি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং বায়ুদূষণও কমবে। তাই ইটভাটা মালিকদের ধীরে ধীরে ব্লক উৎপাদনের দিকে যেতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, সরকার চায় পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার বাড়ুক। ব্লক উৎপাদন সেই দিকেই একটি বড় পদক্ষেপ। এতে পরিবেশ রক্ষা ও শিল্প—দুটিই টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
তবে ভাটা মালিকরা বলছেন, প্রচলিত ইটভাটা থেকে হঠাৎ ব্লক উৎপাদনে রূপান্তর সহজ নয়। এর জন্য বড় বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বাজার নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন।
একজন ভাটা মালিক বলেন, ব্লক উৎপাদনে যেতে হলে আমাদের প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও বাজার নিশ্চয়তা দরকার। না হলে ছোট ও মাঝারি মালিকরা টিকে থাকতে পারবেন না।
আরেকজন মালিকের ভাষ্য, সরকার যদি বিকল্প চায়, তাহলে ধাপে ধাপে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিতে হবে। একদিকে কড়াকড়ি, অন্যদিকে বিকল্প সুবিধা না দিলে শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।
সাতকানিয়ায় ইটভাটা শিল্প শুধু নির্মাণ উপকরণ সরবরাহ করে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাটাগুলোতে মৌসুমে বিপুল শ্রমিক কাজ করেন, পরিবহন ব্যবসা সচল থাকে, স্থানীয় দোকান-বাজারে বেচাকেনা বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে ভাটার উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই পুরো অর্থনৈতিক চক্রে প্রভাব পড়ছে। শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন, ট্রাক পরিবহন কমে যাচ্ছে, স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ইটভাটা শিল্প প্রয়োজনীয়, কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে তা চলতে পারে না। কৃষিজমির টপসয়েল কাটলে জমির উৎপাদনশীলতা কমে যায়। তাই আমরা আইন অনুযায়ী কঠোর নজরদারি করছি।
তিনি আরও বলেন, অনুমোদনবিহীন ভাটা বা অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে মালিকদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে