সুন্দরবনে নতুন আতঙ্ক ‘পরগাছা’: শ্বাসরোধ হয়ে মারা যাচ্ছে প্রাণভোমরা সুন্দরী গাছ

ডেস্ক রিপোর্ট 

​বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একমাত্র রক্ষাকবচ এবং জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষার দেয়াল সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ ‘সুন্দরী’ আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে। আগে থেকেই ‘আগামরা’ বা টপ ডাইং রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলেও বর্তমানে নতুন ও ভয়াবহ আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে ‘পরগাছা’। এই নীরব ঘাতক পরজীবী ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলছে বয়স্ক গাছগুলোকে। দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে সুন্দরবনের পুরো ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সুন্দরবনের বর্তমান পরিস্থিতি নিজ চোখে দেখতে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে দৈনিক সকালের সময়ের পক্ষ থেকে সুবতি এলাকার গহিন অরণ্যে সরেজমিন অনুসন্ধান চালানো হয়। গহিন বনে যত ভেতরে যাওয়া যায়, ততই চোখে পড়ে একের পর এক রোগাক্রান্ত ও মৃতপ্রায় গাছ। কিছু গাছ পুরোপুরি শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, কিছু আগামরা হয়ে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বেশির ভাগ সুন্দরী গাছের গায়ে ধূসর-বিবর্ণ কিংবা গাঢ় সবুজ রঙের পরগাছার আস্তরণ। শরণখোলা উপজেলার বকুলতলা গ্রামের ৩০ বছরের অভিজ্ঞ বনজীবী সাইফুল ইসলাম জানান, পাঁচ-ছয় বছর আগেও যেসব জায়গায় সুন্দরী গাছের ঘন জঙ্গল ছিল, তা এখন প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। নবীন-প্রবীণ জেলে ও বাওয়ালিদের মতে, এমন পরগাছার প্রাদুর্ভাব আগে কখনো দেখা যায়নি।

​বয়স্ক সুন্দরী গাছে তিন ধরনের পরগাছা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি জানান, এর প্রভাবে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ গাছ আক্রান্ত এবং অনেক গাছ মরে দাঁড়িয়ে আছে, যা বন বিভাগের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ওয়াসিউল ইসলাম জানান, সুন্দরী গাছে মূলত ‘মিসলটো’ (Mistletoe) নামক একধরনের ক্ষতিকর পরগাছা এবং একপ্রকার পরাশ্রয়ী ফার্ন আক্রমণ করছে। মিসলটো সরাসরি পোষক গাছ থেকে পুষ্টি শোষণ করে, ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। যেখানে লবণাক্ততা বেশি এবং জোয়ার-ভাটার পানি চলাচল কম, এমন প্রতিকূল পরিবেশে দুর্বল গাছগুলো সহজেই এসব পরজীবীর শিকার হচ্ছে।

​সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিও-কলম্বাস’ নামক একটি গবেষক দল সুন্দরবনের আন্দারমানিক, কটকা, করমজলসহ বিভিন্ন স্থানে গবেষণা পরিচালনা করে বেশ কিছু উদ্বেগজনক তথ্য তুলে এনেছে। তাদের ফিল্ড পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পরজীবীর প্রভাবে সুন্দরী গাছের গড় উচ্চতা মারাত্মকভাবে কমেছে। আগে যেখানে গাছগুলো ৪০-৪৫ ফুট লম্বা হতো, তা এখন ২৫-৩০ ফুটে নেমে এসেছে। মিসলটোর পাশাপাশি ফাইটোপথোরা (Phytophthora) ও বোট্রিওডিপ্লোডিয়া (Botryodiplodia) নামক ছত্রাকের আক্রমণে গাছে ক্ষত, শিকড়ে পচন এবং পাতার ব্লাইট ডিজিজ সৃষ্টি হচ্ছে। সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে হরিণ, কাঁকড়া ও মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সেই জায়গা দখল করছে অধিক লবণাক্ততাসহিষ্ণু গাছ যেমন গরান ও গেওয়া।

​সুন্দরী গাছ রক্ষা এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে গবেষক ও পরিবেশকর্মীরা বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্যসচিব মো. সাইফুল ইসলাম ও অন্যান্য গবেষকদের মতে, উজান থেকে পশুর ও বলেশ্বর নদের মাধ্যমে সুন্দরবনে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়ানো অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ। পাশাপাশি, শীত মৌসুমে এসব পরগাছায় ফুল ও ফল আসে যা পাখিদের মাধ্যমে এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়ায়, তাই এর আগেই আক্রান্ত ডালপালা থেকে পরগাছা সরিয়ে ফেলতে পারলে বংশবিস্তার রোধ করা সম্ভব। নদী ভরাট বন্ধ করা, অবৈধ বাঁধ নির্মাণ রোধ করা এবং খালগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে মিঠা পানি ও নোনা পানির ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। পরগাছা ও ছত্রাকের এই নীরব আগ্রাসন এখনই রুখতে না পারলে একসময় সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তাই পরিবেশের এই অপূরণীয় ক্ষতি রোধে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.