মো.সেলিম উদ্দিন খাঁন
চকরিয়া পৌরসভার হালকাকারা এলাকার আমান্যার চর ব্রিজ সংলগ্ন স্থানে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে পুলিশের হাতে ৫ জন গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। পুলিশের মামলার নথি, স্থানীয়দের বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে সংঘটিত হামলার অভিযোগ বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ডাকাতচক্রের সম্ভাব্য আশ্রয়দাতা ও সহযোগীদের বিষয়ে নানা প্রশ্ন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সহকারী পুলিশ সুপার (চকরিয়া সার্কেল) অভিজিৎ দাশের তত্ত্বাবধানে এবং চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে গত ২৫ মে ২০২৬ রাত আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। খবর ছিল, একদল ডাকাত আমান্যার চর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ডাকাতির উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে।
স্থানীয়দের সহযোগিতা ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পরিচালিত অভিযানে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাতদল পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় একটি সিএনজিসহ ৫ জনকে আটক করা হয়। তবে পুলিশের দাবি, আরও দুটি সিএনজিযোগে ৮ থেকে ১০ জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—আইয়ুব আলী, ইব্রাহিম সোহেল, আবু হানিফ, সাইফুল ইসলাম ও নাজিম উদ্দিন। অভিযানকালে তাদের কাছ থেকে একটি সিএনজি, কোড়াবাড়ি, লোহার খন্তি, ধারালো ছোরা, দা এবং ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধভাবে ডাকাতির উদ্দেশ্যে সেখানে সমবেত হওয়ার কথা স্বীকার করেন এবং পূর্বে বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীদের লক্ষ্য করে ডাকাতি কার্যক্রমে জড়িত থাকার তথ্য দেন। এ ঘটনায় চকরিয়া থানায় পেনাল কোডের ৩৯৯ ও ৪০২ ধারায় মামলা নং-৫৩ (তারিখ: ২৬ মে ২০২৬) রুজু করা হয়।আসামির বসবাস ঘিরে নতুন প্রশ্নঃ:অনুসন্ধানে জানা যায়, মামলার অন্যতম আসামি ইব্রাহিম সোহেল ওরফে ‘সোহেল ডাকাত’ দীর্ঘদিন ধরে ইলিশিয়া ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হামিদুল হক মানিক এর শশুর বাড়ি তথা তার স্ত্রী সুলতানা রাজিয়ার বাপের বাড়িতে বসবাস করে তার অবৈধ কার্যকলাপ পরিচালনা করে আসছে দেদারসে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হামিদুল হক মানিক এর শশুর বাড়ি তথা রাজিয়ার বাপের বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, মাদকসেবীদের আড্ডা, যৌন আবৃত্তি এবং সন্দেহজনক ব্যক্তিদের যাতায়াত ছিল। এক কথায় রাজিয়ার বাপের বাড়ি সক্রিয় ডাকাত দলের অঘোষিত আস্তানা।ইলিশিয়া ২ কিলোমিটার রাস্তাসহ আশপাশের এলাকায় নিয়মিত তাদের ডাকাতি পরিচালনা হয়ে আসছে। ডাকাতি করা জিনিসপত্র গুলো ওই বাড়িতেই ভাগ বাটোয়ারা করে বলে জানা যায়।যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।তবে স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র এমনটাই বলেছে।অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে, হামিদুল হক মানিক, তার দুই ছেলে রাহাদুল হক বাবু ও রাফিদুল হক ছোটন,সুলতানা রাজিয়া,রাজিয়ার ভাই নুরুল কাদের রাসেল প্রকাশ রাশেল ডাকাত,স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দু শুক্কুর ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ এর নেতা আবদুল্লাহ আল মামুন সরাসরি ডাকাতচক্রের সাথে সম্পৃক্ত। এছাড়া আরও একটি অভিযোগে বলা হয়, চকরিয়া থানার তৎকালীন ওসি বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী থাকাকালীন সময়ে এক সাবেক এসআইয়ের সঙ্গে সুলতানা রাজিয়ার ছোট বোন রেবেকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে বিয়েও হয় বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করে। চাকরিচ্যুত হওয়ার পরও ওই সাবেক এসআই মাঝেমধ্যে এলাকায় আসেন বলে জানা যায়। তার প্রভাব ব্যবহার করে প্রশাসনিক মহলকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করা হয়—এমন অভিযোগও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে উঠেছে। বাবলা চেয়ারম্যানের নাম কেন আলোচনায়? স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়ন আওয়ামিলীগ এর সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাবলা সক্রিয় ডাকাতদলের সেল্টারদাতা এবং তাঁর পার্শ্ববর্তী বাড়িটাই সক্রিয় ডাকাতদলের গোপন আস্তানা। বিশ্বস্ত সূত্র বলছে ওই বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসতেছে অনৈতিক কর্মযজ্ঞ।এইসব জানার পরেও মোটা অংকের যোগসাজশে চুপ রয়েছেন বাবলা চেয়ারম্যান। সচেতন মহলের দাবি, ‘যদি ডাকাতি মামলার আসামিদের আশ্রয়স্থল সত্যিই তার পার্শ্ববর্তী বাড়ি হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি তার নজরে অবশ্যই এসেছিলো কিন্তু তিনি ম্যানেজ হয়ে উপর্যুপরি কোন ব্যবস্থা নেননি বা নিতে দেখা যায়নি। বরং তাদের সেল্টার দিচ্ছে। এছাড়াও তিনি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন সহ পশ্চিম বড় ভেওলার আরো অনেকে বাবলা চেয়ারম্যান এর ওখানে তাঁর সেল্টার এই রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার সন্দেহে হামলার অভিযোগঃ ডাকাতি মামলার ঘটনার এক সপ্তাহের মাথায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, গত ২ জুন বিকেল ৫টার দিকে ইলিশিয়া বাজারের হাকিম সওদাগরের কুলিং কর্নারে বসে থাকা আবু তাহের নামের এক ব্যক্তির ওপর হামলা চালানো হয়। ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, হামিদুল হক মানিকের নেতৃত্বে রাহাদুল হক বাবু, রাফিদুল হক ছোটনসহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি তাকে অভিযুক্ত করেন যে তিনি ইব্রাহিম সোহেলকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। একপর্যায়ে তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের চেষ্টা করা হয় এবং তাকে হুমকি প্রদর্শন করা হয়। স্থানীয়দের সহায়তায় তিনি রক্ষা পান। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ করেন। এ ঘটনায় আবু তাহের চকরিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ভুক্তভোগী আবু তাহের বলেন,আমি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।ইতিপূর্বেও সোহেল ডাকত,হামিদুল হক মানিক ও অন্যান্য ডাকাতদলের সদস্যরা আমার উপর হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালিয়েছে। এখনো আমার শরীরে “গুলির ক্ষত” রয়েছে।যার যথেষ্ট তথ্য প্রমাণাদি আমার কাছে রয়েছে।
জনমনে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছেঃ গ্রেপ্তার ডাকাতদের প্রকৃত আশ্রয়দাতা কারা?স্থানীয়ভাবে যাদের নাম আসছে, তাদের ভূমিকা কী?
ডাকাতচক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত?
পালিয়ে যাওয়া ৮-১০ জনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কতদূর অগ্রগতি হয়েছে?আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত চলছে কি না?অভিযোগের পর আবু তাহেরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে কি?
প্রতিবেদকের মন্তব্যঃ
ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার, সম্ভাব্য আশ্রয়দাতাদের নাম উঠে আসা এবং পরবর্তীতে অভিযোগকারীর ওপর হামলার ঘটনা—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন শুধু একটি ডাকাতি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয়দের মতে, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণই এখন এলাকাবাসীর প্রধান প্রত্যাশা।
এই বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার, চকরিয়া সার্কেল অভিজিৎ দাশ বলেন, ডাকাতির প্রস্তুতিকালে আটককৃত ৫ জন আসামির বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৩৯৯ ও ৪০২ ধারায় মামলা নং ৫৩, (২৬ মে ২০২৬) ইং তারিখে রুজু করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই পলাতক ডাকাতদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।