নিজস্ব প্রতিবেদক»
তিন মাসের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের। এ কমিটি গত ১৪ জুলাই পা রাখলো ৮ বছরে। সাংগঠনিক রীতি-নীতি ভেঙে চট্টগ্রাম নগরে ‘তছনছ’ এই যুবলীগ এখন ‘মহিউদ্দিন বাচ্চু’র যুবলীগে পরিণত। চট্টগ্রামের যুবলীগের রাজনীতিই হচ্ছে এখন এই এক নেতাকে ঘিরে। তিনি আহবায়কের পদ কাজে লাগিয়ে একক আধিপত্যই ধরে রেখেছেন। অন্যান্য নেতাদের এখানে তেমন কোনো অবস্থানই তিনি তৈরি করতে দেননি নানা কৌশলে।
১০১ সদস্যের আহবায়ক কমিটির মধ্যে মাঝে চার যুগ্ম আহবায়ক ‘ক্ষেপে’ বসেছিলেন আহবায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চুর উপর। পৃথক কর্মসূচিও করেছিলেন তারা বাচ্চুর বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে। কিন্তু মহিউদ্দিন বাচ্চুর কৌশল ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাদের বিরোধীতা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি।
তবে মহিউদ্দিন বাচ্চু এখন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান নওফেলের কাছে কতটা আস্থাশীল তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। নগরজুড়ে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নগর সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিশাল রাজনৈতিক সাম্রাজ্যের হাল ধরেছেন ব্যারিস্টার নওফেল। চট্টগ্রামে বিভিন্ন পদে থেকেও সাংগঠনিকভাবে ব্যর্থদের তিনি কতটা ভবিষ্যতের রাজনীতির সুযোগ দিবেন তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু সময়।
এদিকে নেতাকর্মীদের ধারণা, গ্রুপিংয়ের কারণেই সদ্য গঠিত যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাঁই হয়নি ১০১ সদস্যের কারোরই। করোনা-লকডাউনে প্রকাশ্যে কোনো তৎপরতা না থাকলেও বর্তমানে এই কমিটিতে জ্বলছে তুষের আগুন। যে রাজনৈতিক আগুন স্ফুরিত হতে পারে লকডাউন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই।
গত বছরের ৫ নভেম্বর দারুল ফজল মার্কেটস্থ কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজনের এজেন্ডা নিয়ে নগর যুবলীগের সভা আহ্বান করা হয়েছিল। সভায় নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু উপস্থিত থাকলেও কমিটির অন্য চার যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদ, দেলোয়ার হোসেন খোকা, দিদারুল আলম দিদার ও মাহবুবুল হক সুমন আসেননি। এর আগে শেখ রাসেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠান নিয়েও দুই গ্রুপের মধ্যে কোন্দলের বিষয়টি উঠে আসে।
গত বছরের ১১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মহিউদ্দিন বাচ্চু ও তার অনুসারীদের উদ্যোগে নগরীর কাজিরদেউড়িস্থ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে এবং বাকি চার যুগ্ম আহ্বায়ক ও তাদের অনুসারীদের নিয়ে নগরীর স্টেশনরোডস্থ মোটেল সৈকতে পৃথকভাবে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে যুবলীগের সাবেক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ৮ বছর পরও কমিটি না হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব উঠে আসছে না সংগঠনটি। ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িতদের হাত থেকে কেন্দ্রীয় সংগঠন মুক্তি পেলেও ‘বুড়ো’দের হাত থেকে রেহাই মিলেনি চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের। প্রায় ৫০ ঊর্ধ্ব নেতার নেতৃত্বেই চলছে এই যুবলীগ। তার উপর এই নেতাদের কারও কারও বিরুদ্ধে উঠেছে জমি দখলের অভিযোগও।
৮ বছরের চট্টগ্রাম নগরীর ৪১ সাংগঠনিক ওয়ার্ডের মধ্যে শুধুমাত্র ১০ ওয়ার্ডের কমিটি দিয়েছে এই আহবায়ক কমিটি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক তৎপরতা বলতে এটুকুই অর্জন তাদের। এসব অভিযোগ যুবলীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের। যাদের ব্যক্তিগত ‘ক্ষমতা’ জাহিরের জমায়েতে পদের লোভ দেখিয়ে ৮ বছর ধরেই হাজিরা নিচ্ছেন চট্টগ্রাম যুবলীগের শীর্ষ নেতারা।
বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এই কমিটির নেতাদের কণ্ঠে উঠে একই সুর। তারা নিমিষেই বলে দেন, ‘কমিটি করতে আমরা রাজি। কেন্দ্রীয় কমিটি চাইলেই আমরা দায়িত্ব ছেড়ে দেব। আমাদের এখন আওয়ামী লীগ করার বয়স।’
কিন্তু তৃণমূল নেতাকর্মীদের কথা, ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি করতেই এসব বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। কমিটি না হওয়ার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তারা তা-ই করেছেন ৮ বছর ধরে, যাতে নিজেদের নেতৃত্বের এক যুগ পার করতে পারেন না।’ তাদের দাবি, কেন্দ্রীয় নেতারাই পারেন একমাত্র চট্টগ্রাম যুবলীগের হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে। তারা উদ্যোগ না নিলে এই ১০১ সদস্যের যুবলীগের কয়েকজনের হাতেই জিম্মি থাকতে হবে চট্টগ্রাম যুবলীগকে।
চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে আহবায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু বলেন,
‘সব ওয়ার্ড কমিটি আমরা করতে পারিনি কারণ এসব কমিটি করার আগে কেন্দ্রের বিভিন্ন নির্দেশনা থাকে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানীয় রাজনৈতিক বিষয় থাকে, যারা গুরুজন তাদের বিষয় থাকে, দেশের পরিস্থিতির বিষয়গুলো থাকে। সবকিছু মিলিয়েই আসলে করা হয়নি। কিন্তু আমরা প্রচেষ্টায় ছিলাম। আমরা যখন প্রচেষ্টা চালিয়েছি তখন দেখা গেছে কেন্দ্রের নির্দেশনা এসেছে, চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশে কমিটি বন্ধ রাখতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নগর কমিটি গঠনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির বাইরে কথা বলার সুযোগ নেই। কমিটির সিদ্ধান্ত কেন্দ্র থেকেই দিবে। তাছাড়া কেন্দ্রীয় যুবলীগের সেক্রেটারিকে সামনে রেখে আমি আবেদন-নিবেদিন জানিয়েছি যে, কমিটি করে দেওয়া উচিত। আই এম ফিলিং পেইন’।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৪ জুলাই মহিউদ্দিন বাচ্চুকে আহ্বায়ক ও ফরিদ মাহমুদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ১০১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় যুবলীগ। এদের বেশিরভাগ চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।