কুলসুমা জেলে, এবার মিনুর মৃত্যুর রহস্যজট নিখোঁজ সন্তানের হদিস মিলবে কবে

নিজস্ব প্রতিবেদক»

সাজাপ্রাপ্ত কুলসুমীও গ্রেফতার হল। গ্রেফতার হল কুলসুমীর বদলে মিনু জেল খাটানোয় সহযোগিতাকারীরাও। কিন্তু জেল থেকে বের হয়ে সাত দিনের মাথায় সড়ক দূর্ঘটনায় রহস্যজনকভাবে মিনুর মৃত্যুর নেপথ্যে অন্যকিছু আছে কি-না তা বের হয়নি। এখনো খোঁজ মিলেনি মিনুর নিখোঁজ হওয়া ছোট ছেলের। যে কি-না মিনুর মৃত্যুর পরপরই নিখোঁজ হন। তার খোঁজ মিলবে কবে- এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায়।

রোববার (১ আগস্ট) চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট শফিউদ্দিন আহমেদের আদালতে কুলসুমী ও তার সহযোগী মর্জিনা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

তারা জানায়, মাত্র দেড় লাখ টাকায় মিনুকে প্রলোভন দেখিয়ে কুলসুমীর বদলে জেল খাটায় দুই দালাল . নুর আলম কাওয়াল (৪৮) ও মো. শাহাদাত হোসেন। পুলিশ তাদেরও গ্রেফতার করেছে।

জানা যায়, ২০০৬ সালে কোতোয়ালী থানার রহমতগঞ্জ এলাকায় পোশাককর্মী কোহিনুর আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে আত্মহত্যা বলা হলেও পুলিশি তদন্তে উঠে আসে কোহিনুরকে গলা টিপে হত্যা করে তা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর আত্মহত্যা মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয় এবং মামলার বিচার শেষে ২০১৭ সালের নভেম্বরে আসামি কুলসুম আক্তারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত। সাজার পরোয়ানামূলে কুলসুম আক্তারের বদলে মিনু আক্তার ২০১৮ সালের ১২ জুন কারাগারে যান।

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন বলেন, ‘পোশাক শ্রমিক কহিনুর আক্তারকে হত্যার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত কুলসুম আক্তার নিজেকে বাঁচাতে তার ঘনিষ্ঠ মর্জিনার পরার্মশে শাহাদাত ও কাওয়াল নামে দুই দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা দেড় লাখ টাকায় মিনু আক্তারকে কুলসুমের হয়ে জেল খাটার প্রলোভন দেখায়। এক মাসের মধ্যে মিনুকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও দেয়। এতে মিনু রাজি হয়। কিন্তু শেষমেশ মিনু এই টাকা পাননি। কিন্তু কুলসুমির বদলে তিন বছর জেল খাটে মিনু।

ওসি বলেন, ‘আমরা দুই দালাল শাহাদাত ও কাওয়ালকে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছি। আমরা বিষয়টির আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করবো।’

এর আগে ২০০৬ সালে নগরীর রহমতগঞ্জে মোবাইলে কথা বলার অপরাধে পোশাক শ্রমিক কোহিনুরকে গলাটিপে হত্যা করে গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখে কুলসুমী। কুলসুমী এই হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও ময়নাতদন্তে বুঝা যায় ঘটনাটি পুরোপুরি হত্যা। দুই বছর তদন্তের পর পুলিশ আদালতে এই মামলার চার্জশীট জমা দেয়।

২০১৭ সালে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে কুলসুমী আক্তারের যাবজ্জীবন সাজা হয়। ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. নুরুল ইসলাম।

সেই আদেশে ২০১৮ সালের ১২ জুন সাজা ভোগের জন্য কারাগারে যান কুলসুমী। প্রায় তিন বছর সাজা ভোগের পর জানা যায়, কুলসুমীর বদলে জেল খাটছেন নিরাপরাধ মিনু।

চট্টগ্রামের আইনজীবী গোলাম মওলা মুরাদ বিষয়টি সর্বপ্রথম বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করে।

এরপর গত ২২ মার্চ চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চতুর্থ মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঁইয়ার আদালতে মিনুকে হাজির করা হলে আদালত তাকে জামিন দিয়ে মুল আসামী কুলসুমীকে আটকের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেয়।

পুলিশ সাজাপ্রাপ্ত আসামী কুলসুমী ও তাকে সহযোগিতা করার অপরাধে মর্জিনা আক্তার নামে আরও এক নারীকে
বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) ভোরে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।

এদিকে জেল থেকে বের হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় রহস্যজনকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় মিনুর। এরপর গায়েব হয়ে যায় মিনুর ছোট ছেলেও।

এসব ঘটনার পিছনে কুলসুমি ও মর্জিনার হাত থাকতে পারে বলে সন্দেহ জানিয়ে আইনজীবী গোলাম মোওলা মুরাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কুলসুমী ও মর্জিনা একটি অপরাধ ঢাকতে একাধিক অপরাধ করে বসেছেন। এই ঘটনার পিছনে কারা জড়িত ও এমন ঘটনার উদ্দেশ্য কী- তা বের করতে আদালতের নির্দেশনা পেলে ভাল হয়। এই দুইজনকে রিমাণ্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।’

যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কুলসুমী লোহাগাড়া উপজেলার গৌরস্থান মাঝের পাড়া আহাম্মদ মিয়ার বাড়ির আনু মিয়ার মেয়ে। তার বর্তমান ঠিকানা কোতোয়ালী থানাধীন রহমতগঞ্জ সাঈদ ডাক্তারের ভাড়া বাড়ি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.