চট্টগ্রামে ২৭৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী মেঘনা ব্যাংকের পরিচালক

প্রকাশিত: ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০২১

অনলাইন ডেস্ক:

চট্টগ্রামে ব্যাংক ম্যানেজারের যোগসাজশে ২৭৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এক ব্যবসায়ী। বেসরকারি এবি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় জালিয়াতির এই ঘটনা ঘটেছে।

অনুসন্ধান চালিয়ে অর্থ আত্মসাতের নথিসহ বিভিন্ন প্রমাণ হাতে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) উদঘাটন করেছে, শাখাটির ম্যানেজারের সঙ্গে মিলে ওই ২৭৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন মাহিন এন্টারপ্রাইজের এমডি আশিকুর রহমান লস্কর।

নিজের ব্যাংকের সঙ্গেই অভিনব প্রতারণা, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে টাকা আত্মসাতে সরাসরি সহায়তা দিয়েছেন চট্টগ্রামে এবি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার সাবেক ম্যানেজার মুহাম্মদ ইসহাক চৌধুরী।

আশিকুর রহমান লস্কর মেঘনা ব্যাংক লিমিটেডের একজন পরিচালক। যে মাহিন এন্টারপ্রাইজের নামে তিনি পৌনে ৩০০ কোটি টাকা মেরে দিয়েছেন, কাগজেকলমে সেই প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের দক্ষিণ খুলশীর ঠিকানায় অবস্থিত এআরএল গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। এটি মূলত শিপব্রেকিং ইয়ার্ড।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আশিকুর রহমান লস্কর এবি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে প্রথম ধাপে ৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা, দ্বিতীয় ধাপে ৭৭ কোটি ৯০ লাখ, তৃতীয় ধাপে ৮১ কোটি ৪ লাখ ৭৯ হাজার ও শেষ ধাপে ৩৬ কোটি ৪১ লাখ ২১ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সবমিলিয়ে আত্মসাৎ করা মোট টাকার পরিমাণ ২৭৩ কোটি ২৬ লাখ ১০ হাজার টাকা।

অর্থ আত্মসাতের এই ঘটনায় দেশ ও বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংকের সংশ্নিষ্টতা থাকলেও পুরো টাকাই দেওয়া হয়েছে এবি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে।

দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর মাহিন এন্টারপ্রাইজের এমডি আশিকুর রহমান লস্কর ও এবি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার সাবেক ম্যানেজার মুহাম্মদ ইসহাক চৌধুরী পরস্পরের যোগসাজশে ০৬৬৭১৩ এসবিএলসি ০১ নং স্ট্যান্ডবাই এলসি খোলেন। এরপর চট্টগ্রাম ইপিজেডে ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট শাখা থেকে এক কোটি ইউএস ডলার ফরেন ফাইন্যান্স হিসেবে ঋণ করে আগের দায় সমন্বয় করেন।

২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী এক কোটি ইউএস ডলার ফোর্সড ঋণ তৈরি করে ব্যাংকের ৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা গোপনে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে একই শাখা থেকে আরও ৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে।

দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর ০৬৬৭১৩ এসবিএল ০২ নং স্ট্যান্ডবাই এলসির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের লন্ডন শাখা থেকে এক কোটি ইউএস ডলার বিদেশি অর্থ হিসেবে ঋণ করে অন্য ব্যাংকে গ্রাহকের আগের দায় সমন্বয় করা হয়। পরে নতুন বৈদেশিক দায় সৃষ্টি করে এসডিবি স্ট্যান্ডবাই এলসির এক কোটি ইউএস ডলার মূল্যের বৈদেশিক দায় মাহিন এন্টারপ্রাইজ কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করা হয়। ফোর্সড ঋণ তৈরি করে আত্মসাৎ করা এই অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

এরপর তৃতীয় পর্যায়ে এবি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে আত্মসাৎ করা হয় ৮১ কোটি ৪ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। এখানেও লস্কর ও ইসহাক মিলে গত ২০১৪ সালের ৬ জানুয়ারি স্ট্যান্ডবাই ০৬৬৭১৪ এসবিএলসি ০১ নং এলসি স্থাপন করে লন্ডনের হাবিব এলাইড ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকে এক কোটি ইউএস ডলার বিদেশি অর্থ হিসেবে ঋণ করে আগের দায় সমন্বয় করেন। পরে এসডিবি স্ট্যান্ডবাই এলসির এই বৈদেশিক ঋণের দায় মাহিন এন্টারপ্রাইজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করে এক কোটি ইউএস ডলার ফোর্সড ঋণ তৈরি করে ৮১ কোটি ৪ লাখ ৭৯ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

আশিকুর রহমান লস্কর ও ম্যানেজার মুহাম্মদ ইসহাক চৌধুরী চতুর্থ ধাপে ৩৬ কোটি ৪১ লাখ ২১ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। এজন্য তারা ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি স্ট্যান্ডবাই ০৬৬৭১৫ এসবিএলসি ০১ নং এলসি খুলে লন্ডনের ইউনাইটেড ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৫০ লাখ ইউএস ডলার বিদেশি অর্থ হিসেবে ঋণ করে আগের দায় সমন্বয় করেন। পরে নতুন বৈদেশিক দায় সৃষ্টি করে এসডিবি খাতের ৫০ লাখ ইউএস ডলার মূল্যের বৈদেশিক দায় মাহিন এন্টারপ্রাইজ কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করে ফোর্সড ঋণ তৈরি করে ৩৬ কোটি ৪১ লাখ ২১ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন।

ব্যাংকের রেকর্ডপত্র যাচাই করে দুদক বলছে, লস্কর ও ইসহাক দুজনেই মানিলন্ডারিং অপরাধ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২-এর ৪(২), দণ্ডবিধি-১৮৬০-এর ৪০৯/৪২০/৪৬২(ক)/ ৪৬২(খ)/১০৯ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় আইনি ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে দুদক।