চবিতে চার বছরেও সুরাহা হয়নি তিন অভিযোগের; অকার্যকর যৌন নিপীড়ন সেল

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) যৌন নিপীড়ন সেলে গত চার বছরে তিনটি অভিযোগ জমা হলেও সুরাহা হয়নি একটিও। এতে এই সেলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। সেলে অভিযোগ দিলেও ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী হন না কমিটির সদস্যরা। হাইকোর্টের আদেশ থাকার পরও যৌন নিপীড়ন সেলের কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কমিটিগুলো সচল থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি অনেকাংশেই বন্ধ করা যেতো। শিক্ষার্থীরা বলছেন, নিরাপত্তার অভাব ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই ক্যাম্পাসে বারবার যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তার ঘটনা ঘটছে।

সর্বশেষ গত ১৭ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন ও অশ্লীল ভিডিও ধারণের ঘটনা ঘটেছে। এরপর জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবিতে সরব হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে হেনস্তার শিকার হন দুই ছাত্রী। ছাত্রলীগের চার কর্মী ওই দুই ছাত্রীকে হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় কারও শাস্তি হয়নি। এ ছাড়া ২০১৮ সালের শেষ দিকে দুই ছাত্রী যৌন হয়রানির শিকার হন বলে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। এ দুই অভিযোগেরও নিষ্পত্তি হয়নি। সেলের অভিযোগের বাইরে আরও তিনটি ঘটনার কোনো সুরাহা করেনি প্রশাসন।

ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী বলেন, কমিটি গঠন কেন হয় বুঝি না? কয়েকবার মিটিংয়ে আমাদের ডাকা হলো। অথচ প্রায় এক বছর হতে চলল কোনো সিদ্ধান্তই দেয়নি কমিটি। অভিযুক্তরা অবাধে ক্যাম্পাসে ঘুরছে। এভাবে পার পেয়ে যায় বলে ক্যাম্পাসে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা জানান, ‘সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী হেনস্থার ঘটনায় তদন্ত করতে গেলে দেখা যায় জড়িতরা সবাই সরকারদলীয় কর্মী। যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নির্দ্বিধায় এসব কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে। ফলে এসব ঘটনায় বিচার হওয়ার আগমুহূর্তে কর্মীদের বাঁচাতে নেতারা বাঁধা হয়ে দাঁড়ান। আর তাদের চাপে প্রশাসনও কোন ব্যবস্থা নিতে পারেন না। এতে বছরের পর বছর ধরে এসব অভিযোগ ঝুলে থাকে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যৌন হয়রানি বন্ধে ২০০৯ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে নির্দেশ দেন আদালত। নির্দেশনা অনুযায়ী সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি গঠনের কথা থাকলেও ১৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩০টি পাবলিক এবং ৪৯টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি।

ইউজিসি জানিয়েছে, ৭৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি থাকলেও বেশির ভাগ কমিটিই নিষ্ক্রিয়। অভিযোগ এলে তদন্ত করতে কমিটির অনীহা, তদন্ত করলেও প্রতিবেদন দাখিল ও ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করা হয়। এমনকি কমিটির কার্যক্রমে গোপনীয়তাও অনেক সময় রক্ষা করা হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের এ নির্দেশনা অনুযায়ী বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ-বিষয়ক সেল গঠিত হলেও তা কোনো কাজেই আসছে না। কখনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কখনো বা নিজেদের মধ্যেই এসব ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করতে না পারা এবং সচেতনতার অভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বেড়েই চলেছে।

জানা গেছে, ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নির্যাতন সেলের বর্তমান কমিটি গঠন করা হয়। যার আহ্বায়ক হচ্ছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম নারী উপাচার্য। অথচ তাঁর দায়িত্বকালে ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগের কোনো সুরাহা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

তবে এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া বলেন, `যৌন নিপীড়নের ঘটনায় আমরা একটা প্রাথমিক তদন্ত করে হাইকোর্টের নির্দেশিত অভিযোগ কমিটিকে হস্তান্তর করি। তারা আবার জড়িতদের সাক্ষাৎকার নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে রিপোর্টগুলো তৈরি করে। তবে ওনাদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা নেই, তারা শুধু অভিযোগ গঠন করবে। তারা অভিযোগটি হাইকোর্ট নির্দেশিত যৌন নিপীড়ন কমিটিকে হস্তান্তর করবে। এই কমিটির সদস্য সবাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক না। এখানে ইউজিসির সদস্য আছেন, চুয়েট থেকে আছেন, আইনজীবী আছেন, মানবাধিকার কর্মী আছেন। সবাইকে একোমোডেট করে এই মিটিংগুলো করতে হয়, যেন কোনো নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি না পান বা কেউ কাউকে ফাঁসিয়ে দিতে না পারে। সেই জায়গা থেকে সময় নিয়ে নির্দিষ্টভাবে সবাইকে আইডেন্টিফাই করা হচ্ছে।’

প্রক্টর বলেন, ‘যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলোর রিপোর্ট ফাইনাল স্টেজে আছে, আমি অনেকবার খবর নিয়েছি। আর দুয়েকটা ফাইনাল মিটিং হলেই ওনারা কার দোষ কতটুকু বা কার কী শাস্তি হবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এই কমিটির সবাই যেহেতু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের না, তাই সবাইকে সবার অফিসের কাজ গুছিয়ে এসে মিটিং করতে একটু বিলম্ব হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চলমান ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করছে বলে জানা প্রক্টর।’

সূত্র: সিভয়েস

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.