কোন যোগ্যতায় একসঙ্গে তিন পদে ছাত্রলীগ নেত্রী, বাহাদুরিতে ক্যাম্পাসে বিব্রত নেতাকর্মীরা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ-

 

সৈয়দ আককাস উদদীন

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে এক ব্যক্তিকে একটি পদ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক ছাত্রলীগ নেত্রী প্রথমে পদ ভাগিয়ে নেন চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগের। জেলা ইউনিটের সহ সভাপতি হয়ে তিনি প্রথম দফা অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসেন ফেসবুকজুড়ে। তার কিছুদিন যেতে না যেতেই এই ছাত্রীর কপালে উঠে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদকের মুকুট।

এখানেই শেষ নয়, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেত ভেসে উঠেই এই ছাত্রলীগ নেত্রীর কেন্দ্রীয় নেতা বনে যাওয়ার নথি। এতে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়েছেন তিনি।

 

রাতারাতি ছাত্রলীগের এতগুলো পদে আসীন হওয়া নেত্রীর নাম শামীমা শিমা। চবি পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৫-২০১৬ সেশনের শিক্ষার্থী তিনি। রাজনীতির মাঠে নবীন এই ছাত্রলীগ কর্মীর একসঙ্গে এতো পদ পাওয়া নিয়ে ফেসবুকজুড়ে উঠেছে সমালোচনার ঝড়।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কোনো স্তরের নেতাকর্মীরাই তা মেনে নিতে পারছে না। তারা প্রকাশ্যেই নানাভাবে সমালোচনায় মেতেছেন ফেসবুকে।

 

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করলেও শত শত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর ভাগ্যে মিলেনি পদ নামক এই ‘সোনার হরিণ’। কিছু নেতাকে ‘মেন্টেন’ করেই জেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় কমিটিতে একযোগে পদ পেয়েছেন শামীমা শিমা।

তাদের প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত ছাত্রীকে সংগঠিত করা কিংবা মৌলবাদ বিরোধী তৎপরতায় তার যদি কোনো বিশেষ অবদান থেকেও থাকে তবুও কি তাকে তিনটা ‘ভাইটাল’ পোস্ট দেওয়া যায়? শামীমা শিমা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করে তাহলে কিভাবে চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগে পদ পায়? আবার চাঁদপুরে রাজনীতি করলে কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে পদ পায়? তার কি এমন যোগ্যতা বা ছাত্রলীগের জন্য তার কি এমন অবদান যে তাকে তিনটা পদ দিতে হবে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী জানান, কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ করা ছাড়া শামীমা শিমার কোনো রাজনৈতিক অবদান নেই। ৫-৬ জন ছাত্রীর সঙ্গে ক্যাম্পাসে এলে ঘুরাফিরা করতে দেখা যায় তাকে। এর বাইরে এমপি, মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা হলে ছবি তুলে ফেসবুকে প্রচার করেন তিনি। অথচ ২০১০ থেকে শিবিরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবনবাজি রেখে ছাত্রলীগকে সংগঠিত করতে হলগুলোতে যারা কাজ করেছে তাদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক কিংবা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হতে পারেনি। তাদের অনেকেই কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হতে চেয়েছেন। কিন্তু রাজনীতি না করা কারও হাতে এই পদ দেওয়ার পর তারা আর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হতে চান না।

 

এদিকে শামীমা শিমা কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল টিপুকে দেখা গেছে যারপরনাই ‘খুশি’ হতে। তাকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তার পথ চলা সুন্দর হওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করতে দেখা গেছে টিপুকে।

তবে ইকবাল টিপুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগের ভিএক্স গ্রুপের একসময়ের নেতা মিজানুর রহমান বিপুল শামীমা শিমার কেন্দ্রীয় পদ পাওয়াকে উড়িয়ে দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আপনারা যারা দায়িত্ব নিয়ে প্রাণের সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগটাকে নিলামে তুলতেছেন মনে রাখবেন আপনারা একদিন প্রকৃতির নির্মম বিচারের সম্মুখীন হবেন। ধিক্কার জানাই আপনাদের এমন উন্মুক্ত নিলামের বিরুদ্ধে। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে নিজের বাবা মা জানেনা সন্তান কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে গেছে। এটা অন্যায়,এটা লজ্জার। বি:দ্র: যারা ৩১শে জুলাইয়ের পেড এখন প্রকাশ করছেন তারা অবশ্যই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের সাথে সরাসরি কথা বলে প্রচার করবেন অনথ্যায় পোষ্ট রিমুভ করতে করতে টায়ার্ড হয়ে যাবেন।’

 

খোদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ছাত্র বৃত্তি বিষয়ক উপ সম্পাদক ফৌজিয়া নিজাম তামান্না তিন পদ নিয়ে ‘বাহাদুর’ বনে যাওয়া শামীমা শিমার কেন্দ্রীয় নেত্রী হয়ে ওঠার খবর চাউর হওয়ার পর এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘ছাত্রলীগে কর্মী শূন্যতা দেখা দিয়েছে। পদ দেবার মত কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না’

 

চবি ছাত্রলীগের সহ সভাপতি সাদী আহমেদ তার দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছেন, ‘ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত চবি ছাত্রলীগ।

 

একই দিনে একাধিক পোস্ট-পদবী নিজের নামে করে নেয়ার নজির চবি ছাত্রলীগে নাই। যুগে যুগে অনেক মাথা মোটা, বোকা সোকা লোক নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিয়ে শুন্য হাতে ফিরে গিয়েছে। হয়তো তাদের ত্যাগের ক্ষেত্র টা উপযুক্ত ছিল না, ভুল জায়গাতে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছে। সঠিক জায়গাতে নিজেকে উজার করে দিতে পারলে বিয়ে করে, ঘর সংসার সামলে, একাধিক ইউনিট সামলে কেন্দ্রকেও সামলানো যায়।

আধুনিক নারী জাগরণের মহিমান্বিত আদর্শিক নারী কর্মীর এহেন সাফল্যে তীব্র ঈর্ষান্বিত বোধ করছি। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া চবি ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর পাওনা একাই আদায় করে নেয়ার সংগ্রামের অগ্রসেনানী, চবি ছাত্রলীগের সোনালী অর্জন, চবি ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের প্রভাবশালী সদস্য ও সহ-সম্পাদক, একই সময়ে এই সকল পোস্ট নিজের নামে করে মহান নেত্রীর হাত ধরে এগিয়ে যাক  বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।’

 

রিদুয়ানুল হাকিম নামে এক ব্যক্তি শামীমা শিমার দেওয়া ফেসবুকে পোস্টে কমেন্ট করেছেন, ‘বাকি আছে উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড, সাথে বাকি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ও সাংগঠনিক পোদ নিয়ে নেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান জয় ভাইয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি বাকি পোস্ট গুলার জন্য বিনীত আবেদন জানাচ্ছি।’

 

শাহেদ আলম তানভীর নামে একজন লিখেছেন, ‘আপনার পরিশ্রমে সিস্টেম টা একটু বলবেন..? আমার অনেক ভাই ব্রাদার তো জীবন উৎসর্গ করে ফেলছে.. এই ছাত্রলীগের একটা কমিটিতে জায়গা পাওয়ার জন্যে.. আপনি তো মা শা আল্লাহ ৩ টা পদের মালিক..

পরিশ্রমে টোটকা টা স্ট্যাটাস দিয়ে বলে দিলে.. হাজারো ছাত্রলীগ নেতা কর্মীর লাভ হতো..’

 

 

শাফায়েত হোসেন নামে একজনের কমেন্ট হলো, ‘ছাত্রলীগে আপনার ডেডিকেশনটা কী জানতে চাই!যার দরুন একের পর এক বড় বড় পদ আপনার দখলে চলে যাচ্ছে।এগারো বছর টানা রাজনীতির পাশাপাশি শিবির বিরোধী আন্দোলনের লড়াকু সৈনিদের যেখানে একটি পদ আনতে কষ্টের সীমা নাই সেখানে আপনি কত সহজে তিন তিনটি বড় পদ নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছেন। যদি আপনার বিষয়ে সঠিক তদন্ত হতো হয়তো পদগুলো আপনি পেতেন না। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতাদের দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য লক্ষ্য করা গেছে।’

 

মো. শফিউল আলম নামে একজন লিখেছেন, ‘হাজারো ত্যাগের বিনিময়ে, যোগ্যতাবলে একই দিনে ৩টা পোস্ট পেয়েছে। ছাত্রলীগের আসন্ন সম্মেলনে আপনাকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চাই।’

 

 

এম ইউ সোহেল নামে একজন লিখেছেন, ‘তুমি জানতা না আপু? পর পর তিন ছক্কা মারলে যে শুণ্য হয়!’

 

ইমাম হাসান সৈকত নামে একজন লিখেছেন, ‘আপনি তিন জায়গায় পদবী নিলে আর বাকীরা কি করবে!

কি এমন পরিশ্রম, ত্যাগ করছেন আপনি তিন জায়গার কমিটিতেই থাকতে হবে,,,,দল কি দেউলিয়া হয়ে গেছে নাকি যে আপনার মতো একজনকে তিন জায়গায় পদায়ন করতে হবে’

 

সোহাগ মৃধা নামে একজনের প্রশ্ন, ‘কোন যোগ্যতার বলে আপনি তিনটি ইউনিটের পদ পান? আর কিভাবে এই তিনটি ইউনিটের দায়িত্ব পালন করবেন যদি একটু সংক্ষিপ্ত আকারে বলতেন।’

 

সাইফ আলম নামে একজন লিখেছেন, ‘আপনি প্রয়োজনে দুইটা পোস্ট ছেড়ে দেন। এক্ষেত্রে উদার মানসিকতার দৃষ্টান্তে স্থাপন হবে।’

 

 

জানা গেছে, চলতি বছরের ৫ মার্চ চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহ সভাপতি মনোনীত হন শামীমা শিমা। এই পদ পাওয়ার ৪ মাসের মাথায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক পদ দেওয়া হয় তাকে। একই তারিখের একটি চিঠিতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়  কমিটির সদস্য মনোনীত করা হয় শামীমা শিমাকে।

 

তিনপদের দায়িত্বের বিষয় জানতে তাকে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.