কালিপুর রেঞ্জ: অবৈধ ইটভাটায় মাটি ও জ্বালানি ব্যবসায় স্বয়ং বনবিভাগ

সাতকানিয়ার পাহাড় পুড়ছে বাঁশখালীর ইটভাটায়-

সৈয়দ আককাস উদদীন,চট্টগ্রাম থেকে-

 

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নের ছনখোলা এলাকায় পাহাড় কেটে সমতল করার এক মহোৎসব চলছে, যেখানে প্রশাসনিক সীমানার মারপ্যাঁচকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে প্রভাবশালী ইটভাটা মালিকরা। সাতকানিয়ার পাহাড় কেটে সেই মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পাশের উপজেলা বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়নের লটমনি মৌজায় অবস্থিত ৮টি অবৈধ ইটভাটায়।

 

দুই উপজেলার সীমান্তের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেদারসে পাহাড় ধ্বংস করা হলেও আইনি সীমাবদ্ধতার অজুহাতে বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন। এই পরিস্থিতিতে গত ১৯ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর নামমাত্র একটি মামলা করলেও প্রভাবশালীদের বাদ দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

 

সংরক্ষিত বনায়নের অবৈধ ইটভাটায় মাটি ও জ্বালানি ব্যবসায় স্বয়ং বনবিভাগ

অভিযোগ ওঠেছে সীমানার মারপ্যাঁচের এই সুযোগটা অবৈধ ইটভাটার মালিকরা সরাসরি  গ্রহণ করেন সাধনপুর বনবিট ও পুকুরিয়া বনবিট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে।

বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন যখন অভিযানের প্রস্তুতি নেন তখন কালিপুর রেঞ্জের  রেঞ্জার মনোয়ার হোসেন অবৈধ ইটভাটার মালিকদের থেকে মোটা অংকের টাকা খেয়ে জ্বালানির কাঠ এবং পাহাড় কাটার মাটি বাঁশখালীর আওতাবহির্ভূত রিপোর্ট দিয়ে সংশ্লীষ্ট দপ্তরের বহু অভিযান থামিয়ে দেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

 

শুধু তাই নয়, সাধনপুর বিট অফিসার বাহার উল্লাহ এবং পুকুরিয়ার আশরাফকে দিয়ে টিপি ইস্যুর নাম দিয়ে চট্টগ্রাম মুখী শত শত গাড়ী থেকে নেয়া হচ্ছে দৈনিক হারে মাসোহারা।

কালিপুর রেঞ্জের লটমনি মৌজাটায় পুরো সংরক্ষিত বনায়ন।

সংরক্ষিত বনায়নের ভেতর ইটভাটা থাকায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দপ্তরের কথা বলে ৭টি ইট ভাটা থেকে নেয়া হয় মাসিক মাসোহারা।

এবং সাতকানিয়া- বাঁশখালীর সকল পাহাড় কেটে সাঁবাড় করার বিনিময়ে সাধনপুর বিট অফিসার বাহার উল্লাহ এবং পুকুরিয়ার বিট অফিসার আশরাফ বড় দাগের টাকা নিয়ে রেঞ্জার মনোয়ার হোসেনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলা বন সংরক্ষক কার্যালয় ম্যানেজ’র জন্য সংশ্লীষ্ট কর্তাদেরও উৎকোচ পৌঁছে দেয়।

 

দীর্ঘদিনের অবৈধ কারবারির পথ চেনা:

এদিকে পুকুরিয়া বন বিটের স্টেশন কর্মকর্তা আশরাফ দীর্ঘ আড়াই বছর কালিপুর রেঞ্জের মতো একটি জায়গার দুটি স্টেশনের একই সাথে দায়িত্ব পালন করায়, টিপি ইস্যুর টাকা জোত পারমিটের টাকা এবং মাটিও বনের গাছ কেটে জ্বালানি ব্যবহারের মাসোহারা উপর মহলকে কিভাবে, কি করে, কেমন করে! ম্যানেজ করতে হয় সেটা তার জানা আছে বলেও সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

 

বাঁশখালীর কালিপুর রেঞ্জের সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক  একজন জানান,মূলত আশরাফ সাহেব- রেঞ্জার মনোয়ার হোসেনের আপন মানুষ হওয়ায় দুটি বিটের দায়িত্বে দীর্ঘ আঁড়াই বছর ধরে রেখেছেন এবং থাকতে পেরেছেন।

 

অথচ, বিধি মোতাবেক কর্মস্থলে থাকার কথা দু’বছর।কিন্তু চট্টগ্রাম বন সংরক্ষক কার্যালয়কে বিশেষ মাধ্যমে  হাতে নিয়ে কালিপুর রেঞ্জের রেঞ্জার ও চট্টগ্রাম বন বিভাগ দক্ষিনের শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা মনোয়ার  হোসেনের বদান্যতায় সাধনপুর বনবিট কর্মকর্তা বাহার উল্লাহ এবং আশরাফরা  পার পেয়ে যায়।

 

পুকুরিয়া বনবিট কর্মকর্তা আশরাফকে জোত পারমিটের কাজ ও টিপি তার অধীনে হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি এই বিষয়ে ,জোত পারমিট হয়না তবে অবৈধ ৭/৮টি ইটভাটা সংরক্ষিত বনায়নে পড়ছে সেটা সঠিক।এবং পুরো লটমনি মৌজাটাই সংরক্ষিত বনায়নের আওতায়।

এবং রেঞ্জারের নির্দেশে তিনি  নিয়মিত টিপি চেকিং করা হয় বলেও স্বীকার করেন।

পাহাড় কাটা আর জ্বালানির কথাও স্বীকার করেন।

তবে এসব (লাকড়ি আর মাটি)বাহির থেকে আনা হয় বলেও জানান তিনি।

এবং বর্তমান রেঞ্জার মনোয়ার হোসেন ৩ বছরেরও অধিক সময় ধরে বাঁশখালীর কালিপুরের এই  একই রেঞ্জে আছেন এবং পরবর্তীতে একই পদে থেকে আরো একটি চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের শহর রেঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ  দায়িত্বে আছেন বলেও জানান পুকুরিয়া বিটের এই  কর্মকর্তা মি.আশরাফ।

 

অপরদিকে সাধনপুর বনবিট কর্মকর্তা বাহার উল্লাহও অকপটে বলেন,দূর্নীতি করলে এখানে(কালিপুর রেঞ্জে) যারা দীর্ঘদিন ধরে আছেন তারাই হয়তো করতে পারেন,কিন্তু আমি সাতকানিয়ার মাদার্শা থেকে আসছি মাত্র ৪মাস।

আমি লোডিং আনলোডিং সকল গাড়ী চেক করি ঠিক আছে কিন্তু কোন মাসোহারা তুলিনা।আমি সবসময় গাড়ী পেলে মামলা দেয়ার চেষ্টা করি।

 

অপরদিকে মাসোহারা তোলার কয়েকজন ড্রাইভার ও ডাম্পার গাড়ীর মালিক বলেন,মাদার্শায় যেমন দেওদীঘি বসে বাহার উল্লাহ প্রতি গাড়ী থেকে টাকা নিতো এই সাধনপুরেও একই ভাবে প্রতি গাড়ী হারে টাকা নিচ্ছেন সাধনপুর বিট কর্মকর্তা বাহার উল্লাহ।

 

কালিপুর রেঞ্জ এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের শহর রেঞ্জের একই সাথে এক ব্যক্তির দুটি দায়িত্ব হওয়ায় দৈনিক বিশাল অংকের টাকা নিয়ে বাসায় ফিরছেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের একমাত্র প্রবেশ মুখ  নতুন ব্রীজের দক্ষিণে দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক গাড়ীর ড্রাইভার।

কালিপুর রেঞ্জের সাধনপুরের লটমনি মৌজার সংরক্ষিত বনায়ন থেকে গত বছরের শুরুতেও রেঞ্জার মনোয়ার হোসেন আর পুকুরিয়া বিট কর্মকর্তা আশরাফকে ম্যানেজ করে শতাধিক গাছ কাটছিলো স্থানীয়  গাছ  খেকোরা।

পরে গণমাধ্যমে লেখালেখি হলে তখন একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করে দায় এড়ান বর্তমান এই রেঞ্জার  মনোয়ার হোসেন।

জনশ্রুতি রয়েছে  ওই গাছকাটার মামলায়ও মনোয়ার হোসেন করেছেন বিশাল বানিজ্য।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বাঁশখালীর কালিপুর রেঞ্জার মনোয়ার হোসেনকে কল করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি, পরে তাকে সাংবাদিক পরিচয়ে উপরোক্ত বিষয়ে  বার্তা পাঠালেও কোন উত্তর দেননি।

বাঁশখালীর কালিপুর রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের শহর রেঞ্জের দায়িত্ব পাওয়ায় দিনে দিনে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছেন বলেও সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

তবে সূত্র আরো নিশ্চিত করেছেন, রেঞ্জার মনোয়ার হোসেনের খুঁটির জোর অনেক শক্ত এতদিন এক রেঞ্জে থাকার পরও চাকুরীর  বিধি মোতাবেক বদলী না হয়ে চট্টগ্রাম বন সংরক্ষক আঞ্চলিক  কার্যালয়কে ম্যানেজ করে  উল্টো বাগিয়ে নিয়েছেন চট্টগ্রাম বন বিভাগ দক্ষিণ শহর রেঞ্জের দায়িত্ব।

 

একই ব্যক্তি দুই পদে এবং দীর্ঘদিন বদলী না হয়ে দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন মর্মে  এই বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য -বাংলাদেশ বন বিভাগ আগারগাঁও ঢাকা’র প্রধান আমির হোসেন চৌধুরীকে তার মুঠোফোনে ২বার কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে উপরোক্ত বিষয়  উল্লেখ করে আমির হোসেন চৌধুরীর অফিসিয়াল মেইলে বার্তা পাঠানো হয়েছে।

প্রশাসনিক সীমানার ফাঁদে ইটভাটার মালিকদের পাহাড় কাটা:

সাতকানিয়া উপজেলার পশ্চিমে এওচিয়ার ছনখোলার উত্তর পাশে লটমনি মৌজায় গড়ে উঠেছে হারুনের মালিকানাধীন এইচবিএম ইটভাটা, নুরুল আলম কোম্পানির ওয়ানস্টার ইটভাটা, এএসসি ইটভাটা এবং জামাল কোম্পানির জেবিএম ইটভাটা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ইটভাটাগুলো মূলত বাঁশখালী উপজেলার প্রশাসনিক এলাকার ভেতরে পড়লেও এগুলো সংলগ্ন পাহাড়গুলো সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত।

সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসন যখন এওচিয়ার পাহাড় কাটা নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে যায়, তখন ইটভাটাগুলো লটমনি মৌজায় হওয়ায় তারা প্রশাসনিক এখতিয়ারের অভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ যেন এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা, যেখানে এওচিয়ার পাহাড়ের মাটি পুড়ছে বাঁশখালীর ইটভাটায় কিন্তু জরিমানা গুনতে হচ্ছে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে।

পাহাড় কাটার এই স্পটগুলো পরিদর্শনের সময় ইটভাটার মালিকরা দম্ভের সঙ্গে সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের প্রশাসনিক রক্ষাকবচের কথা জানান। সাতকানিয়ার সংবাদকর্মীদের কাছে তারা দাবি করেন, তাদের ভাটা বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়নে অবস্থিত হওয়ায় সাতকানিয়া প্রশাসনের কোনো ঝামেলা নেই। আবার বাঁশখালীর সাংবাদিকরা পাহাড় কাটার তথ্য জানতে চাইলে মালিকরা পাল্টা যুক্তি দেন যে পাহাড়গুলো সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত, তাই বাঁশখালী প্রশাসনের সেখানে জরিমানা করার কোনো আইনগত অধিকার নেই।

মূলত ইটভাটাগুলো একই জোনে অবস্থিত হলেও খতিয়ানগত ভিন্নতার এই সুযোগটিই তারা কাজে লাগাচ্ছে। এওচিয়ার ছনখোলার জনৈক ইটভাটা মালিক আক্ষেপ করে বলেন, লটমনি মৌজার ভাটাগুলো একই এলাকায় হওয়ায় তারা পাহাড় কাটলে সাংবাদিকরা সাতকানিয়ার মালিকদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করে এবং পরে সাতকানিয়া প্রশাসনের অভিযানের বলি হতে হয় তাদের।

পাহাড়খেকোদের দৌরাত্ম্য ও প্রশাসনের ভূমিকা:

 

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এএসসি ইটভাটায় পাহাড় কাটা নিয়ে বারবার অভিযোগ ওঠায় পরিবেশের কথা বিবেচনা করে মালিক মোর্শেদ কোম্পানি সেটি ছেড়ে দিয়েছেন। তবে বর্তমানে এর নিয়ন্ত্রণে আছেন লোহাগাড়া উপজেলার কুখ্যাত পাহাড়খেকো হিসেবে পরিচিত মালিক শাহ আলম। ইতিপূর্বে লোহাগাড়ায় পাহাড় কাটার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক স্থানীয় সাংবাদিক তার হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। সেই কুখ্যাতি পুঁজি করে তিনি এখন এওচিয়ার পাহাড় কাটার বৈধতা খুঁজে বেড়ান।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জামশেদুল ইসলাম বলেন, ওই ইটভাটাগুলোর বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং ইতিমধ্যে তিনি একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে একটি অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাকিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান।

পরিবেশের মামলার নেপথ্যেও বৈষম্যের অভিযোগ:

পাহাড় কাটার বিষয়টি নিয়ে আঞ্চলিক পত্রিকা  ‘চট্টগ্রাম সংবাদ’সহ  বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. শাহ আলম ও বাঁশখালীর সারোয়ার আলমের বিরুদ্ধে সাতকানিয়া থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। তবে পাহাড় ধ্বংসের মূল কারিগর হিসেবে পরিচিত জেবিএম ইটভাটার মালিক জামাল কোম্পানি, এইচবিএমের মালিক হারুন এবং ওয়ানস্টারের মালিক নুরুল আলম কোম্পানিকে এই মামলা থেকে রহস্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। পাহাড় কাটার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এই প্রভাবশালী চক্রকে মামলার বাইরে রাখায় স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

ধারাবাহিক প্রতিবেদন-০১

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.