আদালত অবমাননার অভিযোগ: হাইকোর্টের আদেশ অগ্রাহ্য করে স্থাপনা ভাঙলো সিডিএ
সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত অবমাননা মামলা হচ্ছে -
সৈয়দ আককাস উদদীন, চট্টগ্রাম থেকে –
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)র চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: নূরুল করিমসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ উঠেছে।
হাইকোর্টের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে বহুতল স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলায় আনা হয়েছে এ অভিযোগ।
রিটকারী পক্ষের আইনজীবী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত অবমাননা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রিটকারীর কৌঁসুলি সুপ্রিমকোর্টের অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল নোমান আজ (বুধবার) জানান, চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুন:খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের দোহাই দিয়ে সিডিএ নিযুক্ত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যালটেক কনসালট্যান্ট লি:’র কর্মচারিরা শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মালিকানাধীন অবৈধ স্থাপনা ভাঙতে উদ্যত হয়। এ প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং রিজিয়া বেগম গং একটি রিট (নং-৮২৫/২০২৪) করেন।
শুনানি শেষে বিচারপতি আকরাম হোসেন চৌধুরী এবং ফয়েজ আহমেদের ডিভিশন বেঞ্চ গতবছর ১৩ জুলাই্ সিডিএ’র কার্যক্রমের ওপর ৬ মাসের স্ট্যাটাসকো দেন।
পরবর্তীতে বাদীপক্ষের আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ এবং বিচারপতি মো: মনজুর আলমের ডিভিশন বেঞ্চ গত ১৮ ডিসেম্বর স্ট্যাটাসকো’র মেয়াদ আরো ৬ মাস বৃদ্ধি করেন।
স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রাম ডেভলপমেন্ট অথরিটি (সিডিএ)র চেয়ারম্যান, সিডিএ’র সচিব,‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুন:খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’র প্রকল্প পরিচালক চট্টগ্রাম কোতোয়ালি সার্কেলের ডেপুটি কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদেরকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়া হয়।
কিন্তু সিডিএ হাইকোর্টের এ নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গত ৬ জানুয়ারি পাঁচলাইশ ‘নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির বাড়ি নং-১৮/বি-১,(আর.এস. প্লট নং-১৫৬,১৫৮,১৬০,১৬১, বিএস প্লট নং-১৬৮) প্লট নং-১,,২ এবং রোড নং-৪ এ অবস্থিত ১২ তলা ভবন ভেঙ্গে ফেলে। বিএস শিটে আদি খালের প্রস্থ ৪৮ ফুট।
ভেঙ্গে দেয়া ভবনটি খালের অপর পাড়ে অবস্থিত সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ওয়াল থেকে ৫১ ফিট বাদ দিয়েই নির্মাণ করা হয়েছে।
দেয়াল থেকে পরিমাপ না ধরে সিডিএ কর্তৃপক্ষ নিজেদের ইচ্ছেমতো ধৈর্ঘ্য-প্রস্থ কম-বেশি করছে। বাড়িটি কোনোক্রমেই খালের অংশ নয়। অ্যাডভোকেট নোমান বলেন, এটি সরাসরি আদালত অবমাননা।
কারণ রিটে প্রকল্প পরিচালকে বিবাদী করা হয়েছে। হাইকোর্ট তার নির্দেশনায় সিডিএ এবং রিটকারী উভয়পক্ষকে স্থিতি অবস্থা বজায় রাখতে বলেছেন। কিন্তু সেটি অগ্রাহ্য করে একতরফাভাবে সিডিএ আদালত অবমাননা করেছে। আমরা এ বিষয়ে নোটিশ করছি ।
‘কোর্ট অব কনটেম্পট’ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এদিকে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুন:খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক মেগা প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। ভারত পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার সরকার কয়েক দফা প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ায়। বাড়িয়েছে অর্থ বরাদ্দও।
শুরুতে এটির ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। হাসিনার মেগা প্রকল্প মানেই মেগা লুটপাট। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত, বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে (অ্যালটেক কনসালট্যান্ট লি:-এসিএল) ‘পরামর্শক’ নিয়োগ করা হয়।
এ প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক্রমে প্রকল্পের ব্যয় বাড়াতে নকশা বিকৃত করা হয়।
আদিখালের নকশা অনুসরণ না করে কোথাও খালের প্রস্থ বাড়ানো হয়, কোথাও করা হয় সংকুচিত। এভাবে ৯৭ কিলোমিটার দীর্ঘ মেগা প্রকল্প দেখিয়ে মেগা লোপাটের লক্ষ্যে দুই দফা বরাদ্দ ও সময় বাড়ানো হয়।
বদলে ফেলা হয় প্রকল্পের নামও। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এখন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অথচ চট্টগ্রাম নগরীর পানিবদ্ধতা সামান্যতম লাঘব হয়নি। সিডিএ সূত্র জানায়, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী আহম্মদ মঈনুদ্দীন।
তার বিরুদ্ধে রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির এন্তার অভিযোগ। মির্জাখাল পুন:খনন ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় তিনি বিভিন্ন বাড়ি থেকে ‘নোটিশ বাণিজ্য’র মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন অন্তত: শত কোটি টাকা । নামে- বেনামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, মির্জা খালের ওপর নির্মিত অবৈধ স্থাপনা ‘মেজ্জাইনা বাড়ি’র মালিকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন ৪০ লাখ টাকা। বিনিময়ে ওই বাড়ি উচ্ছেদ না করেই এগিয়ে নেন ‘মির্জা খাল পুন:খনন ও সংস্কার কার্যক্রম।
একইভাবে এস.আলম গ্রুপের মালিকানাধীন খালের ওপর নির্মিত অবৈধ ‘র্যানকন’ ভবন বাঁচিয়ে খালটিকে ‘ইউটার্ন’ করে খনন করা হয়। বিনিময়ে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে অন্তত: আড়াই কোটি টাকা। এ রকম বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।
একইভাবে খালের সম্পত্তির বাইরে গিয়ে স্থাপনা করেছেন-এমন বাড়িও ‘খালের অংশ’ দেখিয়ে নোটিশ দিয়ে ভাঙ্গার উদ্যোগ নেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আহম্মেদ মঈনুদ্দীন। তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
মূল বরাদ্দ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। অর্থের বিনিময়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করা এবং খালের বাইরের ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ি উচ্ছেদের অভিযোগ সত্য নয়।
যারা এ অভিযোগ করেছেন, তাদেরকে বলুন দুর্নীতির প্রমাণ দিতে। তিনি আরো বলেন, হাইকোর্ট যে স্থগিতাদেশ দিয়েছে সেটি ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ির ওপর।
খালের জায়গার ওপর নয়। আমরা বৈধ স্থাপনাই উচ্ছেদ করেছি। ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো ভবন ভাঙিনি।