তিন স্তরের নিরাপত্তা, শতাধিক সহযোগী উখিয়ার ইয়াবা ডিলার কামালের অদৃশ্য সাম্রাজ্য
ইয়াবা সাম্রাজ্য দেখভালের জন্য মরিচ্যাকেন্দ্রিক রয়েছে শক্তিশালী বাহিনী
বিশেষ প্রতিবেদক,চট্টগ্রাম
সীমান্তপথে পিতার অনুসরণে চোরাই পণ্য পারাপারের মাধ্যমে ব্ল্যাক ব্যবসা শুরু করলেও সময়ের ব্যবধানে কামাল হয়ে উঠেছেন একজন শীর্ষ ইয়াবা ডিলার। সীমান্তের ওপার থেকে এখন আর তার নামে অবৈধ সিগারেট আসে না, আসে লাখ লাখ পিস ইয়াবা।
এই ইয়াবা কারবার নির্বিঘ্ন রাখতে সীমান্ত এলাকাজুড়ে কামাল গড়ে তুলেছেন তিন স্তরের নিরাপত্তা বাহিনী। এদের রয়েছে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা বিশেষ করে একাধিক মোটরসাইকেল, সিএনজি ও টমটম।
বাহিনীর সদস্যরা বিভক্ত হয়ে কাজ করে। এক গ্রুপ মগদের কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে অন্য গ্রুপের হাতে পৌঁছে দেয়। আরেকটি গ্রুপ পাহারার দায়িত্বে থাকে। অপর একটি গ্রুপ ইয়াবা বহনকারীদের পাহারা দিয়ে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
কামালের ইয়াবা সাম্রাজ্য দেখভালের জন্য মরিচ্যাকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী বাহিনীও রয়েছে। এই বাহিনীতে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স, সুবিধাভোগী সাংবাদিক, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী নেতা এবং কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। ইয়াবা ডিলার কামাল সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক মিয়ানমার থেকে সীমান্ত, সীমান্ত থেকে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদরদপ্তর পর্যন্ত বিস্তৃত।
ফলে দীর্ঘ এক দশক ধরে ইয়াবা কিং কামাল দাপটের সঙ্গে কারবার চালিয়ে গেলেও তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
এজন্য সিন্ডিকেটের বৈঠকে কামাল গর্ব করে বলেন, কক্সবাজারের র্যাব, বিজিবি, পুলিশ বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কোনোটিই তার নামে কখনো মামলা দিতে পারবে না, ভবিষ্যতেও কোনো মামলার সম্ভাবনা নেই।
ব্যাপক খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, কামালের সিন্ডিকেট সদস্যরা পালংখালী থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে।
মরিচ্যাকেন্দ্রিক ইয়াবা কারবারি ও সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন চেকপোস্ট এলাকার দুই সহোদর মিজান ও সাইফুল, জসিম, ফার্মেসি ও বিকাশ ব্যবসায়ী আলিম ও বেলাল, তুলাবাগান এলাকার আলোচিত কারবারি মিজান, পাগলিরবিলের ‘৩৭ কামাল’, ডাকাত তোফায়েল, ডাকাত টিটু, মঞ্জুর খলিবা, লম্বা মিজানসহ অর্ধশতাধিক কারবারি।
এই আলোচিত সিন্ডিকেটের অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মরিচ্যার জেএসআর ভবনের ওপরতলা।
কয়েক দিন আগে সিন্ডিকেটের নিয়মিত ইয়াবা ক্রেতা পাগলিরবিলের লম্বা মিজানের ভগ্নিপতি, চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা জাহেদ ড্রাইভার বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ চট্টগ্রাম পুলিশের হাতে আটক হন। সূত্র জানায়, জব্দকৃত ইয়াবাগুলো তিনি ডিলার কামালের কাছ থেকে কিনে ঢাকায় নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।
এদিকে সচেতন এলাকাবাসীর মন্তব্য, একজন শীর্ষ ইয়াবা কারবারি কীভাবে বছরের পর বছর দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে না এসে পার পেয়ে যাচ্ছেন, তা রহস্যজনক।
সূত্র মতে, ইয়াবা ডন কামাল অত্যন্ত ধূর্ত। ঠান্ডা মাথায় তিনি পুরো ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করেন।
তাই দীর্ঘ এক দশক ইয়াবা সাম্রাজ্য পরিচালনা করলেও তিনি ইয়াবা তালিকা ও মামলার বাইরে রয়ে গেছেন।
অথচ প্রতিদিন ডজন ডজন কাট ইয়াবা তার নামে সীমান্ত পেরিয়ে আসে। এসব ইয়াবা তার বহনকারী সিন্ডিকেট সদস্যদের মাধ্যমে লিংকন রোড ও রামু বাইপাস হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।
প্রচার রয়েছে, মরিচ্যা চেকপোস্টের পাশে বাড়ি হওয়ায় কামাল ও তার সিন্ডিকেট সদস্যরা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাদের ইশারা পেলে ইয়াবা বহনকারী গাড়িগুলো তল্লাশি করা হয় না।
এভাবেই টেকনাফ থেকে পালংখালী, পালংখালী থেকে ঘুমধুম, উখিয়া হয়ে সোনাইছড়ি সীমান্ত পর্যন্ত মাদক সাম্রাজ্যে একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে কামাল সিন্ডিকেট।
অভিযোগের বিষয়ে কামালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
প্রশাসন বলছে, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। শীঘ্রই মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে।