শুভ জন্মদিন বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের এক মহানায়ক

 

“আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ,
তোমার বুকে শুয়ে আছে এক মহামানব,
তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান।”

একটি জাতির জন্ম হয় শত শত বছর অপেক্ষার পর, রক্ত, ঘাম, সংগ্রামের পর। কিন্তু সেই জাতিকে স্বাধীনতার দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় একজন মহামানবের, এক মহানায়কের, যিনি শুধু নেতা নন—তিনি ইতিহাসের স্থপতি, জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই মহানায়ক, যাঁর জীবন ও কর্ম না থাকলে আজকের বাংলাদেশ হয়তো শুধু স্বপ্নই থেকে যেত। ১৭ মার্চ ১৯২০—সেই শুভ দিন, যেদিন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেন এক শিশু, যিনি একদিন হয়ে উঠবেন স্বাধীনতার প্রতীক, স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার কারিগর। বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মা সাহারা খাতুনের ঘরে জন্ম নেওয়া এই শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু বাংলার মাটি তাঁকে যে ভূমিকায় দাঁড় করিয়েছিল, তা কেবল এক নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি পরিণত হয়েছিলেন এক জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক, এক অবিনশ্বর চেতনায়।

বঙ্গবন্ধুর শৈশব কাটে টুঙ্গিপাড়ার মধুমতীর স্নিগ্ধ বাতাসে, নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ পরিবেশে। ছোট থেকেই তিনি ছিলেন অন্যদের চেয়ে আলাদা—দুরন্ত, সাহসী, অন্যায়ের প্রতিবাদী। গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তাঁর নেতৃত্বগুণ ফুটে উঠতে থাকে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করত, অন্যায়-অত্যাচার তাঁকে বিদ্রোহী করে তুলত।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু সেই বিরতিও তাঁর মানসিক শক্তিকে দুর্বল করতে পারেনি। বরং তিনি আরও সচেতন হয়ে উঠেছিলেন সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি। কৈশোর থেকেই রাজনীতির প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল প্রবল। যখন অন্য ছেলেরা খেলাধুলায় মগ্ন, তখন তিনি ভাবছিলেন মানুষের অধিকার নিয়ে, নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পথ খুঁজছিলেন।

১৯৪০-এর দশক ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তাল সময়। তরুণ মুজিব তখন ছাত্র। সেই সময় থেকেই তিনি রাজনীতির মাঠে নেমে পড়েন, মুসলিম ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তখন থেকেই তিনি বুঝতে পারেন যে, এই রাষ্ট্রের ভেতর বাঙালির জন্য কোনো সুবিচার নেই।
১৯৪৮ সালে যখন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র করল, তখন তিনি প্রথম প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। কারাবরণ করেন, তবু আপস করেননি। এরপর একে একে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি সংগ্রামে তিনি ছিলেন প্রথম সারির নেতা।

১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণার পর তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা। ছয় দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ, পাকিস্তানি শাসকদের চোখে বিদ্রোহ। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, অথচ ততদিনে তিনি হয়ে উঠেছেন ‘বঙ্গবন্ধু’—বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির হাতে ক্ষমতা দিতে চাইল না। বঙ্গবন্ধু তখন ধৈর্যশীল অথচ আপসহীন। ৭ মার্চ ১৯৭১, রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দাঁড়িয়ে তিনি এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন—
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই এক ঘোষণাতেই তিনি জাতিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে দিলেন। এরপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে গণহত্যা চালালে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তাঁর নামেই বাঙালি লড়াই করল, রক্ত দিল, দেশ স্বাধীন করল।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। বঙ্গবন্ধু তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২, তিনি ফিরে এলেন স্বাধীন বাংলাদেশে। রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন—
“বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, কিন্তু আমাদের সংগ্রাম শেষ হয়নি।”
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দাঁড় করিয়েছিলেন এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে। শূন্য হাতে শুরু করে অর্থনীতি পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, সংবিধান প্রণয়ন—সবকিছুই তাঁর নেতৃত্বে হয়।
কিন্তু ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছিল। দেশীয়-আন্তর্জাতিক চক্রান্ত তাঁকে ঘিরে ধরল। তবুও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মানুষের উন্নতি, দেশের স্বাধীনতা, স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়াই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, এক অভিশপ্ত ভোরে ঘাতকেরা বুলেটবৃষ্টি ঝরিয়ে হত্যা করল এই মহানায়ককে। সপরিবারে তাঁকে হত্যা করা হলো। শেখ রাসেল—সে তো ছিল এক শিশুমাত্র! তাকেও ক্ষমা করা হলো না।

এই দিন কেবল বঙ্গবন্ধুর হত্যাই হয়নি, বাংলাদেশের স্বপ্নকেও আঘাত করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ মরেনি। আজ, যখন আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদযাপন করি, তখন শুধু উৎসবের আলোয় নয়, তাঁর আদর্শের আলোয় নিজেদের আলোকিত করাই জরুরি। তিনি যে বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের সৎ হতে হবে, দেশপ্রেমিক হতে হবে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন না হলে, বাংলাদেশও হতো না। তিনি কেবল একজন নেতা নন, তিনি ইতিহাসের স্থপতি। তাঁর জন্ম না হলে আমাদের স্বাধীনতা আসত না, আমাদের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ত।

আজকের প্রজন্মের জন্য তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে হয়।
“তুমি মুজিব, তুমি সূর্য, তুমি বেঁচে থাকবে চিরকাল।”
শ্রদ্ধা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান!

 

মো. কামাল উদ্দিন
লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.