কক্সবাজার: পুরো শহরের অবৈধ যানবাহনের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ( টিআই) খসরুর হাতেই
পরিবহন খাত থেকে প্রতি মাসে কোটি টাকারও বেশি-
ডেস্ক রিপোর্ট
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণের নামে চলছে ব্যাপক অনিয়ম, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ। আর এই পুরো সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কক্সবাজার ট্রাফিক বিভাগের ইন্সপেক্টর (টিআই) খসরু পারভেজ। এমন অভিযোগ উঠেছে পরিবহন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র, চালক ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ট্রাফিক বিভাগের ভেতরের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র। দেখা গেছে, অবৈধ অর্থ আদায়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা চলছে। অনৈতিক উপায়ে প্রতিনিয়ত হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। বিষয়টি নিয়ে পরিবহন চালকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, কক্সবাজার শহরসহ আশপাশের সড়কে চলাচলরত অবৈধ সিএনজি, টমটম, রিকশা, ডাম্পার, ট্রাক ও ফিটনেসবিহীন বিভিন্ন যানবাহন থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এতে যেমন বাড়ছে অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব।
একদিকে বেপরোয়া যানবাহনের চাপ, নিয়ম ভঙ্গ, অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ নানা কারণে চালক ও যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। জেলা শহর ও আশপাশের সড়কগুলোতে সৃষ্টি হচ্ছে নিয়মিত যানজট, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য। অন্যদিকে কক্সবাজারের কলাতলী এখন কার্যত দখল হয়ে গেছে অবৈধ বাস পার্কিংয়ের দৌরাত্ম্যে।
ডলফিন মোড় থেকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পর্যন্ত সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ঢাকা থেকে আসা দূরপাল্লার বাসগুলো দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নিয়ম অনুযায়ী এসব বাস নির্ধারিত টার্মিনালে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা সরাসরি সড়কের ওপরই পার্কিং করছে। এতে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট, বাড়ছে ভোগান্তি, ব্যাহত হচ্ছে পর্যটন নগরীর স্বাভাবিক চলাচল। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
আর এসব অবৈধ পার্কিংয়ের পেছনে রয়েছে মাসোহারা ভিত্তিক একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। নির্দিষ্ট অংকের মাসোহারা পরিশোধের বিনিময়ে এসব বাসকে সড়কের পাশে দাঁড়ানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি বাস থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করা হয়, আর সেই টাকার বিনিময়েই চলে এই অবৈধ সুবিধা। অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো অবৈধ পার্কিং বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন টিআই খসরু পারভেজ।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, কক্সবাজারের পরিবহন খাত থেকে প্রতি মাসে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা তোলা হচ্ছে। বৈধ-অবৈধ সব ধরনের যানবাহন থেকে মাসিক নির্ধারিত হারে ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এছাড়া যানবাহন আটক করে মামলা না দিয়ে নগদ টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও নিত্যদিনের। এই অর্থ আদায়ের জন্য রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। মাঠপর্যায়ে চাঁদা তোলেন কিছু নির্দিষ্ট দালাল ও ট্রাফিক সদস্য, আর পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাÑএমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী জরিমানার টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে চলছে ভিন্ন চিত্র। ট্রাফিক অফিসের ভেতরেই ‘ক্যাশে নিষ্পত্তি’ হচ্ছে অধিকাংশ মামলা।
একাধিক টমটম চালক অভিযোগ করে বলেন, কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও তাদের যানবাহন আটক করে ২ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। কোনো রশিদ বা বৈধ কাগজ দেওয়া হয় না। একদিনে ২০-৩০টি পর্যন্ত টমটম আটক করে রাতে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার হয়। এতে প্রতিদিনই লাখ টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
ট্রাফিক অফিসে গিয়ে দেখা যায়, দরকষাকষির মাধ্যমে টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চালকদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হয়।
এদিকে টমটম চালকের মত মোটরসাইকেল চালক নাঈমুল নামের এক যুবক বলেন, ভাই ট্রাফিক পুলিশের সাথে তর্কাতর্কি করে লাভ কি। আকাশের যত তারা ট্রাফিক পুলিশের তত ধারা। যেমন গাড়ীর কাগজ পত্র ঠিক থাকলে বলবে ড্রাইভিং লাইসেন্স ভূঁয়া! অথবা ড্রাইভিং লাইসেন্স ঠিক থাকলে বলবে, ইঞ্জিন ত্রুটিপূর্ণ।
কোন দোষ খুঁজে না পেলে বলবে বেপরোয়া গাড়ী চালানোর অভিযোগ! কথা একটা গাড়ী দাঁড় করালেই সেলামি বা ‘হ্যান্ডশেক’ করতেই হবে। সার্জেন্টদের ৩০০ টাকার কম দিলে মাইন্ড করে। টাকার রেইটও নাকি সর্ব নিম্ম ২০০ টাকা। এর কম দিলে বলে, ‘ফকিন্নির পোলা-ভিক্ষা চাইছি নাকি?’।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সিএনজি চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কক্সবাজার শহরে সিএনজি চালাতে হলে নিয়ম মেনে চলার চেয়ে ট্রাফিক পুলিশকে মাসিক ‘চাঁদা’ দেওয়া যেন অলিখিত বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে।
তারা জানান, প্রতিটি সিএনজি থেকে মাসে নির্দিষ্ট হারে টাকা নেওয়া হয়, যা না দিলে রাস্তায় গাড়ি চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমরা প্রতিমাসে নিয়ম করে টাকা দেই। না দিলে অযথা গাড়ি আটক করে, মামলা দেয়ার ভয় দেখায়, কখনো কাগজে সমস্যা বের করে, আবার কখনো নতুন অজুহাত দাঁড় করায়।
আসলে টাকা না দিলে রাস্তায় টিকে থাকা যায় না। তারা আরও বলেন, অনেক সময় কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও বিভিন্ন অজুহাতে সিএনজি আটক করা হয়। পরে সেটি ছাড়াতে গেলে নগদ টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। কোনো রশিদ দেওয়া হয় না, পুরো বিষয়টি হয় অনানুষ্ঠানিকভাবে।
একজন চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা দিন আনি দিন খাই মানুষ। প্রতিদিন গ্যাস, মালিকের ভাড়া, সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খাই। তার ওপর আবার মাসোহারা দিতে হয়। এই টাকাটা না দিলে গাড়ি চালানোই বন্ধ হয়ে যাবে। এই টাকা আদায়ের জন্য মাঠপর্যায়ে কিছু লোক নির্ধারিত আছে, যারা নিয়মিত যোগাযোগ করে টাকা সংগ্রহ করে। অনেক সময় সরাসরি ট্রাফিক সদস্যরাও এই টাকা নেন।
তারা দ্রুত এই চাঁদাবাজি বন্ধ করে সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ অর্থ বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) খসরু পারভেজ। তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্দেশনায় এই চাঁদাবাজির কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ করেন সিএনজি চালকরা।
বিষয়ে মন্তব্য জানতে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) খসরু পারভেজের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, ট্রাফিক পুলিশের মাধ্যমে কোনো ধরনের অবৈধ বাণিজ্য বা মাসোহারা আদায়ের সুযোগ নেই। সড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রেও ট্রাফিক বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যদি কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, সেটি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন, কক্সবাজারে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জেলা পুলিশ সবসময়ই তৎপর রয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের কোনো সদস্য বা কর্মকর্তা যদি অনিয়ম, দুর্নীতি বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের অভিযোগ পেলে তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয় এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।
সংগৃহীত তথ্যে জানা যায়, আদায়কৃত অর্থের একটি বড় অংশ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায়। মাঠপর্যায়ের সদস্য থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেও এই অর্থ বণ্টন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে একটি মামলায় একাধিক ধারা থাকলেও টাকা নেওয়ার পর তা কমিয়ে একটি ধারায় নামিয়ে আনা হয়, যাতে কম টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে।
এসব অবৈধ বাণিজ্যের কারণে কক্সবাজারে বেপরোয়া যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে, সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে দিন দিন। পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও সচেতন মহল দ্রুত এই সিন্ডিকেট ভেঙে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, সঠিক তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।