বাঁশখালীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, সঙ্গে ভুতুড়ে বিল! ক্ষোভে ফুঁসছেন গ্রাহকরা

 

 

মুহাম্মদ মিজান বিন তাহের, বাঁশখালী চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পল্লীবিদ্যুতের লাগামহীন লোডশেডিং আর ভুতুড়ে বিলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন লাখো গ্রাহক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না গ্রামাঞ্চলে। এতে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজসহ ব্যবসা-বাণিজ্য। গ্রাহকদের আরও অভিযোগ, নিয়মিত বিদ্যুৎ না পেলেও গুনতে হচ্ছে মাস শেষে ভৌতিক ও অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল। প্রচণ্ড গরমে নির্ঘুম রাত কাটানোর পর দ্বিগুণ-তিনগুণ বিলের কাগজ হাতে পেয়ে চরম ক্ষোভে ফুঁসছেন পল্লী বিদ্যুতের হাজার হাজার গ্রাহক। ভূতের আসরের মতো বিলে তথ্যগত ভুল, পুরোনো পরিশোধিত বিল নতুন করে বকেয়া দেখানো এবং অযৌক্তিক বিলিংয়ের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে পুরো এলাকা। উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে এবং গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে চরম গাফিলতি ও ভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে।

বাঁশখালী পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিস সূত্রে জানা যায়, বাঁশখালী উপজেলায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতায় ৪ টি অভিযোগ কেন্দ্র, সাব-জোনাল অফিস -১টি ও জোনাল অফিস-১ টি সহ গ্রাহক রয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার। এদের মধ্যে কর্মকর্তা রয়েছে ৩ জন, এজিএম-২ জন ও ১জন ডিজিএম কর্মরত রয়েছেন। কর্মচারী রয়েছে ১৫০ জন ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী রয়েছেন ৭৫ জন।

পৌর এলাকার এলাকার বাসিন্দা মোঃ মিজানুল হক জানান মাসে তার বিল সাড়ে ৫ শত টাকা থেকে ৭ শত টাকার মধ্যে থাকলেও এ মাসে এসেছে একলাফে ২ হাজার ৩০০ টাকা, আমার দোকানে ২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে দোকান বন্ধ ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ বিল দেখানো হচ্ছে
১০ হাজার ৩৫১ টাকা। গত জুন ২৬ মাসে ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকা অবস্থা ১০ ইউনিটের বিল করা হয়েছে। এভাবে
দীর্ঘ ৭-৮ মাস যাবৎ মিটারের লাইন কাটা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকা অবস্থায় ও প্রতিমাসে
২০, ৩০ ও ৪০ ইউনিট দেখানো হয়েছে। যাহা সম্পূর্ণ ভুয়া এবং ভুতুড়ে বিল!গন্ডামারা ইউনিয়নের পূর্ব বড়ঘোনা এমদাদ মিয়া পাড়া এলাকার গ্রাহক মোঃ নুর হোসেন বলেন, প্রতি মাসে বিল ৩৫০ টাকা আসলেও এই আগষ্ট মাসে চারগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ শত ৮০ টাকায়।
বাহারছড়া এলাকার মোঃ মনছুর আলম জানান, তার বাড়ি ২ টি লাইট,২ টি ফ্যান ও ১০ টি ফ্রিজ রয়েছে। তার প্রতিমাসে বিল আসত ৩৫০ থেকে ৫০০ টার ভিতরে।
কিন্তু এই আগষ্ট মাসে আমাকে বিল দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার ৫৩৬ টাকা। যাহা সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভুতুড়ে বিল। আমি অভিযোগ দেওয়ার জন্য এই বিল নিয়ে গুনাগরী সাব স্টেশন গেলে, তারা আমাকে মিটারে যা আসছে তা বিল করা হয়েছে বলে জানান এবং কোন সদুত্তর না দিয়ে উল্টো আমাকে বিল পরিশোধ করার জন্য হুমকি ধমকি দেন। না হয় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে বলে জানান।

দক্ষিণ জলদী এলাকার গ্রাহক সামশুল আলম বলেন, ‘বাড়িতে দুটো ফ্যান, একটা ফ্রিজ, একটা টিভি। আমার বিল হয় প্রতি মাসে ৪৫, ৫০ অথবা ৬০ ইউনিট। এবার এই আগষ্ট মাসে বিল দেখানো হয়েছে ২০০ ইউনিট। যাহা সম্পূর্ণ ভূয়া ও মনগড়া বিল।

বাঁশখালী পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহক সংশ্লিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছনুয়া এলাকার মো: হাবিব উল্লাহ মিসবাহ নামে একজন গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশর তথা বাঁশখালীর বিদ্যুৎ হোমিও ঔষুধ এর মতো হয়ে গেছে, ২ ঘন্টা পর পর ২ ফোটা করে দেয়। জলদী মিয়ার বাজার এলাকার ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন আসিফ লিখেছেন, বাঁশখালীতে বিভিন্ন বাসা, দোকান ও মার্কেটে চুরির ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আমাদের সন্দেহ হচ্ছে, রাতের বেলায় এই দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং কি চোরদের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই করা হচ্ছে? বিদ্যুৎ অফিসের সাথে চোরচক্রের কোনো যোগসাজশ আছে কিনা তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তা না হলে রাতের বেলায় এত দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করার কারণ কী? আপনারা যদি এর সঠিক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে সাধারণ জনতা বাধ্য হয়ে আপনাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে।

কৃষকরাও বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমন ধানের চাষসহ অন্য কৃষিকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিলের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের সঙ্গে যোগ হয়েছে নজিরবিহীন লোডশেডিং। স্থানভেদে দিনে ও রাতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসায় শিশু, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ ও গর্ভবতী নারীরা চরম কষ্ট ভোগ করছেন। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা।

রঙ্গিয়াঘোনা এলাকার তৈয়ব বলেন, প্রতিমাসে ৪ শত টাকা থেকে সাড়ে ৫ শত টাকার মত বিল আসে। আগষ্ট মাসে আমাকে বিল করা হয়েছে ২২ শত ৫৬ টাকা। আমার মিটারে জমা আছে ১১০৩ ইউনিট, বিল দেওয়া হয়েছে ১১৪২ ইউনিট। অতিরিক্ত ৩৯ ইউনিট ভূতুড়ে বিল যা মন গড়া করা হয়েছে। এটা নিয়ে আমি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে এসে অভিযোগ জানালে তারা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। উল্টো মামলা মোকদ্দমার ভয় লাগানো হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে শত শত গ্রাহক তাদের বিলের ছবি পোস্ট করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ-সবার একই দশা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, জুন, জুলাই ও আগষ্ট এই তিন মাসে মনগড়া বিল করে সাধারণ গ্রাহককে হয়রানি করা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত বিল। অথচ সারাদিন ২৪ ঘন্টার মধ্যে তিন থেকে চার ঘন্টাও বিদ্যুৎ দেওয়া হত না। এই গরমে এত লোডশেডিং থাকার পরেও এভাবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নেওয়ার কোন যৌক্তিকতা দেখছি না।

পুকুরিয়া এলাকার আফনান , বৈলছড়ী এলাকার মোঃ হেলাল, গন্ডামারা এলাকার মোঃ ইব্রাহিম , পুইছুড়ি এলাকার আশির ও শীলকূপ এলাকার বাহাদুর আলম, সরল এলাকার মোঃ হোসাইন এর মতো শত শত গ্রাহকের বিল চলতি মাসে এক লাফেই দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও। বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা.মুমিনুল হক বলেন, ‘দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। প্রচন্ড গরমে শিশু ও বয়স্ক রোগীরা আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সরকারি ও বেসরকারী কর্মকর্তা চরম বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, এ সময়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার কথা থাকলেও কেন এত দীর্ঘ লোডশেডিং হচ্ছে, তা তাদেরও বোধগম্য নয়।

বিদুৎ সরবরাহ কম থাকলেও গত দুই মাস ধরে গ্রাহকদের হাতে অস্বাভাবিক ও ভৌতিক বিদ্যুৎ বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আয় কমে যাওয়ার এ দুর্দিনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করা হলে জলদি জোনাল অফিস ও গুনাগরী সব- জোনাল অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সদুত্তর না দিয়ে গ্রাহকদের হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, কোনো ধরনের মিটার রিডিং ছাড়াই মনগড়া ও অতিরিক্ত বিল তৈরি করে তা গ্রাহকদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। ফলে উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাহক চরম হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

গ্রাহকদের আরও অভিযোগ, প্রতি মাসে মিটার ভাড়া ও সার্ভিস চার্জসহ বিভিন্ন খাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কেটে নেওয়া হলেও সে অনুযায়ী কোনো সুবিধাই মিলছে না। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ না থাকার সুযোগে বিভিন্ন এলাকায় দোকান ও বাড়ি ঘরের চুরির হিড়িক পড়েছে, যা জনমনে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

ভোগান্তির বিষয়টি নিয়ে বাঁশখালী জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আতিকুর রহমান জানান, জুন ও জুলাই মাসে গরম বেশি থাকায় বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিল কিছুটা বেশি আসতে পারে। চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ায় লোডশেডিং। আমাদের বাঁশখালীতে চাহিদা এই মুহূর্তে ৪২ মেগাওয়াট কিন্তু আমরা পাচ্ছি ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াট। রাত ১১ টার পর আরো কমে আমরা শুধু ৮ বা ৯ মেগাওয়াট পাই। যার কারণে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ বিল নিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎবিল অস্বাভাবিক আসার কোন সুযোগ নেই। গ্রাহক যা ব্যবহার করে সেটাই বিদ্যুৎ বিল আসে। মিটারের রিডিং এর সাথে বিলের মিল থাকলে কোন কিছু করার নাই। মিটারের সাথে যদি রিডিংয়ের মিল না থাকে সেটার অভিযোগ আমরা অবশ্যই শুনব।

এ অবস্থায় স্থানীয় ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন- যেখানে দিনের অর্ধেকটা সময়ই বিদ্যুৎই থাকে না, সেখানে ব্যবহার কীভাবে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বাড়ে? এটি স্রেফ দাপ্তরিক চুরি ও দায়সারা আচরণ ছাড়া কিছুই নয়। অবিলম্বে এই ‘ভৌতিক বিল’ ও গ্রাহক হয়রানির নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং ভুল বিল সংশোধনের জোর দাবি জানিয়েছেন বাঁশখালীবাসী।

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.