মো. সেলিম উদ্দিন খাঁন
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে হওয়া বন্যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মিঠা পানির মাছের বাজারে। মাছের বাজারেও ক্রেতাদের স্বস্তি নেই। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা এবং চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ট্যাংরা ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং চাষের কই ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের রুই মিলছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। ইলিশের দামও চড়া। ৯০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রায় ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বন্যার পানিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার পুকুর, দীঘি ও মাছের ঘের তলিয়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ মাছ ভেসে গেছে। বন্যা-পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট মাছ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে। এরই মধ্যে মিঠা পানির মাছের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় জেলার মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২১০ কোটি টাকা। বন্যার পানিতে ২৩ হাজার ৬১০টি পুকুর, দীঘি ও খামার এবং ৭৮৯টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, পটিয়া উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর ও দীঘি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাউজানের পাঁচটি ইউনিয়নে ৯০টি, চন্দনাইশের ১০টি ইউনিয়নে ৩৮৩টি, লোহাগাড়ার নয়টি ইউনিয়নে ১ হাজার ৬২০টি, মিরসরাইয়ের তিনটি ইউনিয়নে ৯৭টি, সীতাকুণ্ডের তিনটি ইউনিয়নে ১০টি, সন্দ্বীপের ১৩টি ইউনিয়নে ৪১২টি, বোয়ালখালীর নয়টি ইউনিয়নে ৭৫৬টি, আনোয়ারার ১১টি ইউনিয়নে ১ হাজার ১০০টি, বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়নে ২ হাজার ৫০০টি, ফটিকছড়ির ১৮টি ইউনিয়নে ৫৩৩টি, হাটহাজারীর আটটি ইউনিয়নে ১৭০টি, কর্ণফুলীর পাঁচটি ইউনিয়নে ৫৫৭টি এবং রাঙ্গুনিয়ার ১২টি ইউনিয়নে ২৭০টি পুকুর-দীঘির মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।
চাষিরা বলছেন, বন্যার পর পুকুরের পানি দূষিত হওয়া এবং পানির গুণগত মানের পরিবর্তনের কারণে মাছ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক পুকুরে মাছ মরে ভেসে উঠছে। এতে একদিকে চাষিরা নতুন করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন, অন্যদিকে বাজারে মাছের সরবরাহ কমে গেছে।
স্থানীয় মাছ চাষিদের অভিযোগ, বন্যা-পরবর্তী সময়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে না। রোগাক্রান্ত মাছের চিকিৎসা, পানি ব্যবস্থাপনা ও পুকুর পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের মাছ চাষি আব্দুস সবুর বলেন, বন্যার পানিতে পুকুরের মাছের বড় একটি অংশ ভেসে গেছে। যেসব মাছ রয়ে গেছে, সেগুলোর অনেকগুলো এখন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আমার কার্প জাতীয় সব মাছ মারা গেছে। বন্যার পর দ্রুত মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রয়োজন হলেও তা পর্যাপ্তভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার এক পুকুর মাছ মরে গেছে। আমার প্রায় ৪ লাখ টাকার ক্ষতি হবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে মিঠা পানির মাছ সরবরাহ কমেছে, ফলে বেড়েছে দাম। দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম বড় মিঠা পানির মাছের বাজার আনোয়ারা উপজেলার কালাবিবির দিঘির মোড়ের মৎস্য আড়ৎ। স্থানীয় গদির মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে এই বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার মিঠা পানির মাছ বেচাকেনা হয়। শাহ আমানত মৎস্য গদির স্বত্বাধিকারী মোশাররফ হোসেন সোহেল ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে চাষিরা পুকুর ও মাছের প্রকল্পে পোনা অবমুক্ত করেছিলেন। বন্যার সময় এসব মাছ বাজারজাত করার উপযোগী হচ্ছিল। কিন্তু বন্যার পানিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অধিকাংশ পুকুর ও ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। আমাদের আশঙ্কাই এখন সত্যি হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের আড়তে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার মিঠা পানির মাছ বিক্রি হয়। এখন বেচাকেনা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে মাছের বাজারে দামও অনেক বেশি বেড়ে গেছে। উপজেলার বিভিন্ন সাপ্তাহিক হাট-বাজারেও মিঠা পানির মাছের সরবরাহ কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্যার আগে মাছের যে দাম ছিল, বর্তমানে একই মাছ প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।
সোমবার নগরের কাজীর দেউড়ি কাঁচাবাজারেও মিঠা পানির মাছের সরবরাহ তুলনামূলক কম দেখা গেছে। বিক্রেতারা জানান, স্থানীয় পুকুর ও ঘের থেকে মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এখন দূরবর্তী এলাকা থেকে মাছ আনতে হচ্ছে। পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও। এদিন বাজারে বড় আকারের কাতল মাছ বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা কেজি দরে। ছোট আকারের কাতল ৪৫০ টাকা, রুই মাছ ৩৫০ টাকা, গুলশা মাছ ১ হাজার ১০০ টাকা, পাবদা মাছ ৪০০ টাকা এবং তেলাপিয়া মাছ ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে আগামী কয়েক মাস চট্টগ্রামের বাজারে মিঠা পানির মাছের সরবরাহে এর প্রভাব থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রামে বন্যায় উৎপাদন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে মিঠা পানির মাছের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মৎস্য ব্যবসায়ী ও চাষিদের মতে, বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পুকুর ও ঘের পুনর্বাসন, মাছের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা এবং চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তা জরুরি। তা না হলে আগামী কয়েক মাসে চট্টগ্রামের মিঠা পানির মাছের বাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হতে পারে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদেরও বাড়তি দামে মাছ কিনতে হবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসন ও মাছের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সম্প্রতি চট্টগ্রাম সফর করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের দ্রুত তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেন এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস দেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে রেণু ও পোনা উৎপাদন বাড়বে, ফলে মাছের ঘাটতিও ধীরে ধীরে কমে আসবে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বন্যায় সবচেয়ে এই খাতে বেশি ক্ষতি হয়েছে। আমরা মৎস্য চাষিদের ঘুরে দাঁড়াতে কাজ করছি। আশা করছি মাছ উৎপাদন এই সংকট কাটিয়ে উঠবে।