ভূমি আমাদের, ত্যাগ আমাদের, অথচ অধিকার কেন অন্যের?
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল, এলএনজি টার্মিনাল ও বিশেষ শিল্পাঞ্চলসহ একের পর এক মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে মহেশখালী-মাতারবাড়ী এখন দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, এই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মূল্য যারা দিয়েছে, সেই স্থানীয় মানুষ আজ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।
যাদের জমি অধিগ্রহণ হয়েছে, যাদের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ হয়েছে, যাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে গেছে, সেই মহেশখালীবাসী আজ নিজেদের এলাকাতেই উপেক্ষিত। উন্নয়নের নামে স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের চাকরির সুযোগ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বহিরাগতদের প্রাধান্য দেওয়া হলেও স্থানীয় তরুণদের বলা হয়েছে— “অভিজ্ঞতা নেই”, “সুযোগ নেই”, “কোটা নেই”।
আজ প্রশ্ন জাগে—
যে মানুষ রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য নিজের কবরস্থান ছেড়ে দিয়েছে,
যে জেলে পরিবার সমুদ্র হারিয়েছে,
যে কৃষক ফসলি জমি হারিয়েছে,
যে পরিবার প্রতিদিন ধূলাবালি ও পরিবেশ দূষণের মধ্যে বেঁচে আছে—
তাদের সন্তানরা কি এই উন্নয়নের অংশীদার হওয়ার অধিকার রাখে না?
মহেশখালী আর পিছিয়ে থাকা জনপদ নয়
অনেকের ধারণা, মহেশখালী মানেই অনগ্রসর ও অশিক্ষিত অঞ্চল। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গত এক দশকে মহেশখালীতে শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন হাজার হাজার মহেশখালীবাসী অধ্যয়ন করছে।
বর্তমান প্রজন্মের আনুমানিক চিত্র বলছে—
প্রায় ৭২% তরুণ-তরুণী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায়
প্রায় ২৮% স্নাতক বা স্নাতকোত্তর সম্পন্ন
প্রায় ১১% ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ও টেকনিক্যাল গ্র্যাজুয়েট
প্রায় ৮% বিভিন্ন শাখার ইঞ্জিনিয়ার
প্রায় ৩% চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী
প্রায় ৬% শিক্ষক ও গবেষক
প্রায় ১৪% দক্ষ কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবশক্তি
অর্থাৎ, মহেশখালী এখন দক্ষ ও শিক্ষিত মানবসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। কিন্তু সেই মানবসম্পদকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে চরম অবহেলা করা হয়েছে।
উন্নয়নের নামে বৈষম্য:
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, মহেশখালী-মাতারবাড়ীর মেগা প্রকল্পগুলোতে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ নিয়োগ বহিরাগতদের মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অদক্ষ শ্রমিক হিসেবেও যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়নি। প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নিরাপত্তাকর্মী, সুপারভাইজার, অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে বহিরাগতদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর পুনর্বাসন বা কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়নি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতারও ঘাটতি ছিল।
চাকরি শুধু আয়ের উৎস নয়। চাকরি মানে মর্যাদা, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ এবং সমাজে সম্মানজনক অবস্থান।
উন্নয়ন জনগণকে বাদ দিয়ে হতে পারে না!
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বড় শিল্পপ্রকল্পে স্থানীয় জনগণের জন্য বাধ্যতামূলক “লোকাল এমপ্লয়মেন্ট পলিসি” থাকে। কারণ স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন কখনো টেকসই হয় না।
বাংলাদেশের সংবিধানও সকল নাগরিকের সমঅধিকারের কথা বলে। তাহলে মহেশখালীবাসী কেন সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে?
মাতারবাড়ী-মহেশখালীর উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এটি স্থানীয় মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের প্রশ্ন, কর্মসংস্থানের প্রশ্ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
যদি স্থানীয় জনগণ উন্নয়নের সুফল না পায়, তাহলে এই উন্নয়ন একসময় বৈষম্য ও ক্ষোভের প্রতীকে পরিণত হবে।
মহেশখালীবাসীর ন্যায্য দাবি:
বর্তমান সরকারের প্রতি সম্মান রেখে আমরা বলতে চাই— মহেশখালী এখন প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব সমাধান চায়। আমাদের দাবি কোনো দয়া নয়; এটি সাংবিধানিক অধিকার।
আমাদের সুস্পষ্ট দাবি:
১. সকল সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পে কমপক্ষে ৬০% স্থানীয় নিয়োগ কোটা নিশ্চিত করতে হবে।
২. ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরি দিতে হবে।
৩. নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
৪. মহেশখালীতে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি ও প্রকৌশল প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে।
৫. স্থানীয় ঠিকাদার, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৬. স্থানীয়দের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে সংসদীয় তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে।
শেষ কথা:
মহেশখালীর মানুষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। তারা শুধু তাদের ন্যায্য অংশীদারিত্ব চায়।
আজ মহেশখালীর তরুণ সমাজ সংঘাত চায় না, তারা অধিকার চায়। বিশৃঙ্খলা চায় না, তারা ন্যায়বিচার চায়। দয়া নয়, তারা সম্মানজনক অংশগ্রহণ চায়।
কারণ—
“যে উন্নয়ন মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়, তা কখনো পূর্ণ উন্নয়ন নয়।”
আজ সময় এসেছে একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার—
মহেশখালীর উন্নয়ন হবে মহেশখালীবাসীকে নিয়েই।
মহেশখালীর মাটি আজ প্রশ্ন করছে—
“আমাদের জমি যাবে, আমাদের পরিবেশ নষ্ট হবে, আমাদের জীবন বদলে যাবে, অথচ আমাদের সন্তানরাই চাকরি পাবে না— এ কেমন উন্নয়ন?”
এই প্রশ্ন শুধু মহেশখালীর নয়; এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থার প্রশ্ন।
আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার জনগণের কণ্ঠ শুনবে এবং উন্নয়নের এই মহাযজ্ঞে স্থানীয় জনগণকে যথাযথ মর্যাদা ও অংশীদারিত্ব প্রদান করবে।
লিখেছেন –
প্রকৌশলী মনির উদ্দিন
চেয়ারম্যান, আর.এম ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশন সলিউশন
সদস্য, মহেশখালী ইঞ্জিনিয়ার্স ক্লাব