অ্যাক্রেডিটেশন সনদ লাভ : উচ্চশিক্ষায় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য অর্জন

আলী প্রয়াস

 

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গত এক দশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে—অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতিমূলক মাননিয়ন্ত্রণ তথা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, পাঠক্রম, শিক্ষকতার মান, অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার সামগ্রিক মূল্যায়নের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। সম্প্রতি চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচটি স্নাতক পর্যায়ের একাডেমিক প্রোগ্রামের জন্য বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের স্বীকৃতি অর্জন করেছে এবং সেই উপলক্ষে রেডিসন ব্লু’র মোহনা হলরুমে ‘অ্যাক্রেডিটেশন ফেস্ট’ উদযাপন করেছে। এই বিষয়টিকে আমি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রযাত্রার একটি গৌরব ও তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বব্যাপী অ্যাক্রেডিটেশন একটি স্বীকৃত কার্যক্রম। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ কিংবা উন্নত এশীয় দেশগুলোতে বহু দশক আগে থেকেই এই পদ্ধতি চালু রয়েছে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার দ্রুত সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে একাডেমিক মান যাচাই ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হওয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল। এই প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রম, শিক্ষাদান পদ্ধতি, গবেষণা কার্যক্রম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং শিক্ষার ফলাফল—সবকিছু বিশদভাবে মূল্যায়ন করে মানসম্মত প্রোগ্রামগুলোকে অ্যাক্রেডিটেশন সনদ প্রদান করে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়টি ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ), বিএ (অনার্স) ইন ইংলিশ, ব্যাচেলর অব লজ (এলএলবি অনার্স), বিএসএস (অনার্স) ইন ইকোনমিক্স এবং বিএসসি ইন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্নাতক প্রোগ্রামের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন করেছে। একই সঙ্গে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম পেয়েছে ‘কনফিডেন্স সার্টিফিকেট’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একাধিক প্রোগ্রামে একযোগে এই স্বীকৃতি পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী সাফল্য।

অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনের পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি, আত্মসমালোচনা এবং মানোন্নয়নের ধারাবাহিক প্রয়াস। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তার পাঠক্রমকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হয়, শিক্ষাদানের পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করতে হয়, গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হয় এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়। এই পুরো কর্মযজ্ঞটি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় এই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করেছে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামসহ দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী আন্তঃসম্পর্ক, আধুনিক পাঠক্রম, গবেষণামুখী শিক্ষা এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি ধীরে ধীরে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। পাঁচটি প্রোগ্রামে অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন সেই দীর্ঘ পথচলার অনন্য স্বীকৃতি।

এই অর্জনকে ঘিরে আয়োজিত ‘অ্যাক্রেডিটেশন ফেস্ট’ছিল মানসম্মত শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার একটি প্রতীকী আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই আয়োজন একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে—বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন ক্রমশ গুণগত উৎকর্ষের পথে অগ্রসর হচ্ছে।

বিশ্বায়নের এই যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আর জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এর গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে একটি প্রোগ্রামের অ্যাক্রেডিটেশন থাকা মানে সেই প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রশিক্ষিত হচ্ছে এবং বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অর্জন তাদের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আরও উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

অন্যদিকে, অ্যাক্রেডিটেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও একটি দায়বদ্ধতা তৈরি করে। একবার স্বীকৃতি অর্জন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; সেই মান ধরে রাখা এবং আরও উন্নত করা একটি চলমান কার্যক্রমের অংশ। পাঠক্রম হালনাগাদ করা, গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ—এসব বিষয়কে নিয়মিতভাবে গুরুত্ব দিতে হয়।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই ধরনের অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু সংখ্যাগত বৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে যখন তা মানগত উৎকর্ষের সঙ্গে সমন্বিত হয়। অ্যাক্রেডিটেশন উদ্যোগ সেই মানোন্নয়নের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করে। ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও উৎসাহিত করে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে।

এক্ষেত্রে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের কেন্দ্র থেকে দূরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েও তারা একাধিক প্রোগ্রামে অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে আন্তরিক প্রচেষ্টা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা থাকলে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদান করা সম্ভব। এটি চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই অর্জনের প্রকৃত মূল্য তখনই দৃশ্যযোগ্য হবে যখন এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিদিনের শিক্ষাব্যবস্থায় বাস্তবায়ন হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা—এসব বিষয়ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরি করা।

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্রেডিটেশন অর্জন এবং সেই উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব একটি বৃহত্তর বার্তা বহন করে—বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এখন ধীরে ধীরে গুণগত উৎকর্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানচিত্রে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। আর সেই পথচলায় প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অর্জন নিঃসন্দেহে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.