রাজারকুল রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মাছের ঘের, পাথরের আঘাতেই সেই হাতির মৃত্যু

ঘেরের মালিকের সাথে রেঞ্জার অভিউজ্জামানের গভীর সখ্যতা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে সংরক্ষিত বনে অবৈধ মাছের ঘের থেকে উদ্ধার হাতি শাবকটির মৃত্যু পাথরের আঘাতে হয়েছে বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তিন মাস বয়সী শাবকটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের করা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের এক কর্মকর্তা আজ রোববার চট্টগ্রাম সংবাদকে প্রতিবেদনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে শাবকটির মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের রাজারকুল রেঞ্জের অধীনে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পাথরের আঘাতে শাবকটির মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। এছাড়া আঘাতের ক্ষতস্থানে সংক্রমণ হয়ে পরে সেপটিসেমিয়াও দেখা দিতে পারে, যা তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

স্থানীয় রাজারকুল রেঞ্জের রেঞ্জার জানান, প্রাথমিক তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন—দুর্বৃত্তরা পাথর ছুড়ে শাবকটিকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।

তবে ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেলেও এখনো মামলা করা যায়নি। ঘটনাস্থলের সীমানা নিয়ে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি রেঞ্জ ও কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের রাজারকুল রেঞ্জের মধ্যে জটিলতা রয়েছে।

এর আগে, শাবকটির মৃত্যুর পর সেখানে টানা তিন দিন অবস্থান করে হাতি দম্পতি।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় হলেও প্রশাসনিকভাবে এটি কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের রাজারকুল রেঞ্জের আওতায় পড়েছে।
এবং মাছের ঘেরের চারপাশে রাজারকুল রেঞ্জ কর্তৃপক্ষ ৬০ হেক্টর বাগান ও করেছেন। এবং নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল নেই যা আছে তা কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের রাজারকূল রেঞ্জের।

স্থানীয় ও বন বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরেই মং বেচা মারমা নামে একজন পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে মাছের ঘের তৈরি করেন।সূত্র নিশ্চিত করেছেন মং বেচা মারমার মাছের ঘেরটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের তাই এই হাতি যখন মাছের ঘেরে নামে তখন মাছের ঘেরের মালিক তাড়া করার উদ্দেশ্যে আঘাত করতে পারেন।

এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের রাজারকূলের রেঞ্জ কর্মকর্তা দূর্নীতির বরপুত্র খ্যাত অভিউজ্জামানকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে মং বেচা মারমা এই মাছের ঘের করেন।

আর এই অপকর্ম ফাঁস হওয়ার ভয়ে রাজারকুল রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জামান তার বাগান করা সাইনবোর্ড লটকানো সংরক্ষিত বনাঞ্চলকেও অস্বীকার করে যাচ্ছেন।

আরো জানা যায় – ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ ঘেরটির চারপাশে প্রায় ৬০ হেক্টর এলাকায় নতুন বনায়ন করে। তবে অজ্ঞাত কারণে অবৈধ ঘেরটি উচ্ছেদ করা হয়নি।

রেঞ্জার অভিউজ্জামান বলেন, ‘ঘেরের মালিক দাবি করেছেন জায়গাটি তার নিজস্ব। অতীতে বন বিভাগ নাকি জমিটি পরিমাপও করে দিয়েছিল।’

এই বিষয়ে জানতে মং বেচা মারমার ব্যবহৃত নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাইক্ষ্যংছড়ি রেঞ্জের এক বনপ্রহরী বলেন, ‘মং বেচা মারমা যে স্থানে বসবাস করেন সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক সহজে পাওয়া যায় না।’

অভিউজ্জামান আরও বলেন, ‘অতীতে সেখানে বনায়ন করতে গেলে লামা বন বিভাগ ওই জায়গাটি নিজেদের দাবি করে বাধা দেয়। তাদের ধারণা, ঘটনাস্থলটি লামা বন বিভাগের আওতাধীন। তবে দুই বিভাগের মধ্যে আলোচনা করে সীমানা নির্ধারণের পরই মামলা করা হবে।’

নাইক্ষ্যংছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা তানভীর খলিল চৌধুরী বলেন, ‘ঘেরটির চারদিক পাহাড়ঘেরা। আশপাশের পাহাড়গুলোতে রাজারকুল রেঞ্জের আওতায় বনায়ন করা হয়েছে। ফলে ঘটনাস্থল তাদের অধীনে হওয়ার সম্ভাবনা কম।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে জায়গা নিয়ে আগে বিরোধ হয়েছিল, সেটি হাতি শাবকটির মৃত্যুর স্থান থেকে অনেক দূরে তাই বর্তমান হাতির মৃতস্থল অবশ্যই রাজারকূল রেঞ্জের।

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.