আওয়ামী লীগ নেতার অশালীন ‘অডিও’, তোলপাড় ফেসবুক

ঢাকার এক কলেজ ছাত্রীর সঙ্গে চট্টগ্রামের এক কথিত কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতার অশালীন ফোনালাপ ছড়িয়ে পড়েছে সামজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ১৫ মিনিটের সেই ফোনালাপের পুরোটা জুড়েই রয়েছে অশ্লীল বাক্যালাপ। কথিত নেতার এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকেই। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের ওয়াকিবহালরা এই নেতাকে নওশাদ মাহমুদ রানা বলে শনাক্ত করেছেন। তারা বলছেন, ৫৩ বছর বয়স্ক রানা রাজধানীর এক কলেজছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক রেখে আসছেন অনেকদিন ধরেই— এই তথ্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকেরই জানা। ব্যক্তিগত জীবনে রানা বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক।

চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা নওশাদ মাহমুদ রানা ছিলেন কেন্দ্রীয় যুবলীগের আগের কমিটির সদস্য। পরে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে থাকেন। গত বছরের অক্টোবরে সাইফুল ইসলাম নামে চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীকে দিনদুপুরে ফিল্মি স্টাইলে অপহরণ করে সমালোচিত হন কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক নেতা নওশাদ মাহমুদ রানা।

আলোচিত এই অডিও রেকর্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে নওশাদ মাহমুদ রানা চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এই ভয়েস রেকর্ডটি অনেক আগের।’ এটা তার বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি যার কাছ থেকে টাকা পাই, উনিই মূলত এসবের নায়ক।’

তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করছে, চট্টগ্রামের কথিত কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা নওশাদ মাহমুদ রানা ওই তরুণীর সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বিশেষ মুহূর্ত কৌশলে ভিডিও করে রেখে মেয়েটিকে অবৈধ সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য করেন।

১৫ মিনিটের সেই ফোনালাপের পুরোটা জুড়েই কথা চলেছে অশালীন ভাষায়। রাজধানীর পুরান ঢাকায় থাকা সেই তরুণী জীবনধারণে সমস্যার কথা জানিয়ে বারবার গ্রামের বাড়ি ফিরে যেতে চাইলেও অপরপ্রান্ত থেকে বারবার খরচ চালানোর আশ্বাস দিয়ে ঢাকায় থাকতে চাপ দেওয়া হতে থাকে। মোবাইলের সেই কথোপকথনে ওই মেয়েটি বারবার ঢাকায় নিজের অনিশ্চয়তার কথা জানালে অপরপ্রান্ত থেকে একপর্যায়ে ভবিষ্যতে আর ‘হেল্প’ না করার হুমকি দেওয়া হয়। এর একপর্যায়ে মেয়েটির বড় বোনকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়।

ঢাকার কোনো একটি ক্লাবে নিয়মিত ‘গোপন অভিসারের’ প্রসঙ্গ টেনে মেয়েটিকে সেখানে স্থায়ী আইডি করে দেওয়ারও আশ্বাস দেওয়া হয়।

কথোপকথনের শুরুতে অপরপ্রান্ত থেকে ওই তরুণীকে ভিডিও কলে আসতে বারবার চাপ দেওয়া হতে থাকে। তরুণী মোবাইলে সমস্যার কথা জানালেও অপরপ্রান্ত থেকে পাতলা জামা পরে বৃষ্টিতে ভেজার জন্য প্রলুব্ধ করা হতে থাকে। ওই তরুণী এ সময় বলেন, ‘আপনার আগেই সবকিছু আমার মোবাইলে ইয়ে করে দিছি। আপনি বাসা থেকে বের হইতেছেন, আপনি ওখানে যাচ্ছেন, এসব আমার মোবাইল চলে আসলে, তখন আমি ভয় পেয়ে যাই।’ অপরপ্রান্ত থেকে তখন বলা হয়, ‘ধুর মিয়া, এগুলো হবে না। বের হতে পারতেছি না। এটা সাইফুল্যার (সাইফুল ইসলাম) বৌ করতেছে, কারো না কারো দিয়ে। ওর জামাই জেলে তো— এগুলো করতেছে, বুঝতেছি না, এটা কে?’

মেয়েটি এ সময় নিজের ভীতির কথা জানিয়ে বলেন, ‘ওই জায়গায় আমার ভয় ঢুকে গেছে। আমি গেলে, আমার যখন ভয় লাগে যে, ইভেন একটা সময় আমার ইয়েটা ভিডিও করে রেখে দিয়ে আপনার ‘ওয়াইফ’কে কল দেবে যে?’

এ সময় ওই তরুণী তার বাসা ভাড়ার সমস্যার কথা জানালেও অপরপ্রান্ত থেকে তরুণীর সঙ্গে শরীরী মিলনের প্রসঙ্গ বারবার টেনে আনা হয়। কথোপকথনের একপর্যায়ে কোনো একটি ক্লাবের প্রসঙ্গ আসে। মেয়েটি বলেন, ‘আপনাকে বলছিলাম যে আমাকে পারমানেন্ট একটা আইডি করে দেন। বারবার ওখানে নাম লেখাতে গেলে বুঝে যায় আমি আসছি।’ এতে সম্মতি দিয়ে অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘করে দিচ্ছি। ওইদিন করছো না পারমানেন্ট আইডি। কাটছাঁট করার পর ওখানে এখন পুরাতন স্টাফরা আর নেই।’ তখন মেয়েটি বলেন, ‘আমার কথা হচ্ছে যে এরকম একটা আইডি করে দেন, যেটা ‘শো’ করলে আমি ভেতরে সরাসরি ঢুকে যেতে পারব।’

কথোপকথনের একপর্যায়ে মেয়েটি বলে, ‘আমি এ মাসে থাকব ঢাকায়। পরে চলে যাব। মাস্টার্সে ভর্তি হতে হবে। সবাই বলছে মাস্টার্সে গ্রামে ভর্তি হওয়ার জন্য, এখান থেকে ভর্তি হলে চাপ হয়ে বেড়ে যাবে।’ একথা শুনে অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘শোন, আবার গ্রামে যাবা, আবার বিপদে পড়বা। তখন আর আমি হেল্প করব না— বলে দিচ্ছি।’

মেয়েটি তখন মাস্টার্স শেষ করার কথা জানিয়ে শহরে থেকে কলেজে ভর্তি, বাসা ভাড়া খরচ বহন করার সমস্যার কথা জানালে অপরপ্রান্ত থেকে ‘সমস্যা নেই। আমি চালাব’— এমন আশ্বাস দিয়ে ইডেন বা বদরুন্নেসা কলেজে ভর্তির জন্য মেয়েটিকে চাপ দেওয়া হতে থাকে। অপরপ্রান্ত থেকে এই আশ্বাসও শোনানো হয়— ‘ছাত্রলীগ নেতাকে বলে দেব, ইডেনে ভর্তি করে দেবে। বদরুন্নেসায় আমার টিচার আছে।’

কথোপকথনের এই পর্যায়ে জানা যায়, ওই তরুণী পুরান ঢাকায় থাকেন। মেয়েটির বড় বোন ইডেন কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি খুঁজছে। এ সময়ও অপরপ্রান্ত থেকে আশ্বাস দিয়ে বলা হয়, ‘এবার আসলে তুমি মনে করে দিও। আমি ছাত্রলীগের নেতা দিয়ে করে দেব।’

অপরপ্রান্ত থেকে ওই মেয়েকে অনুরোধ করা হয়, ‘তুমি আবার বাড়িতে যেও না। তুমি আবার অঙ্গটঙ্গ নিয়ে ঝামেলায় পড়বে, তখন আমি এ দায়িত্ব নিতে পারব না। তুমি বিসিএস দিবা, মাস্টার্স কমপ্লিট করবা, ঝামেলা শেষ। এটা আমার দায়িত্ব। তোমার বিসিএসের জন্য বইপত্র টাকা পয়সাও তো দিলাম।’

এ সময় কোনো এক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘একটু দোয়া কর, এদিকে কুত্তার বাচ্চা থেকে টাকাগুলো পাচ্ছি না। শুয়োরের বাচ্চা জেলে।’

নিজের ছেলের দুই-তিনদিনের জ্বরের কথা উল্লেখ করে অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘তখন তো আমার ছেলে জ্বর হয়েছিল দুই-তিনদিন, যে অবস্থা হয়েছিল আমার। এখনও জ্বর ছাড়তেছে না।’

অডিও রেকর্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে নওশাদ মাহমুদ রানা বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র। আমি যার কাছ থেকে টাকা পাই, উনিই মূলত এসবের নায়ক। টাকা না দিতে একের পর এক আমাকে নিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং করছে। আমার মানসম্মান ক্ষুন্ন করতে এসব চক্রান্ত করছে।’

তিনি বলেন, ‘এ ভয়েস রেকর্ডটা অনেক আগের। আমি সিআইডি অফিস থেকে এসব তথ্য জানতে পেরেছি। আমি এর আগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। মামলাটি চলমান রয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.