একজন এসপি রশিদুল হক- কনস্টেবল জনিদের বাঁচার স্বপ্ন দেখায়

এসপি রশিদুল হক জনির চিন্তায় নির্ঘুম ছিলেন ৪৮ঘন্টা

সৈয়দ আককাস উদদীন

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় আসামিকে ধরতে গিয়ে সেই আসামির কাছে থাকা ধারালো দায়ের কোপে বামহাত দুইভাগ (কব্জি বিচ্ছিন্ন) হয়ে যায় দায়িত্বরত পুলিশ কনস্টেবল জনি খানের। আহত হয়ে সেখানেই মাটিতে ছিটকে পড়েন তিনি। মাগো-মাগো শব্দে জনি খানের আত্মচিৎকারে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশ। সহকর্মীর কাছে ছুটে যায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। ততক্ষণে তাজা রক্তে মাখামাখি হয়ে ওঠে আশেপাশের কাদামাটি। দায়ের কোপে বিধ্বস্ত জনি খান অন্যহাতে হাতরে বেড়ান শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কাটাহাত। ডানহাতে বা হাতের কাটা কবজি ধরে ব্যর্থচেষ্টা করেন লাগানোর (পূণস্থাপন)। চাইলেই কী কাটাহাত হাত দিয়ে চেপে লাগানো যায়! শুধু হাত নয় মূহূর্তেই পরিবারের বিধ্বস্ত ছবি ভেসে ওঠে জনির চোখে। সে ছাড়া তো দায়িত্ব নেওয়ার মতো আর কেউ নেই পরিবারে। জনি খান কেঁদে ওঠে। চিৎকার করে কাঁদে। দুমরেমুচরে যায় তার শরীর-মন..। 

এরপর মূমূর্ষ অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। পরে সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে।

চমেকে পৌঁছানোর পর কিছুটা আশারআলো জনি খানের বিধস্ত চোখে-মুখে। শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বাঁ হাতের কবজি হয়তো জোড়া লাগাতে পারবেন চমেকের ডাক্তাররা। বিজ্ঞানের অকল্পণীয় সাফল্যে আজকাল কত অসম্ভভই তো সম্ভব হয়।

ঘটনার পর পরিস্থিতি সামলানো থেকে শুরু করে দ্রুত সময়ের মধ্যে পালিয়ে যাওয়া আসামিদের ধরা-স্বাভাবিকভাবেই এর বাহিরে খুব বেশি চিন্তা করার সুযোগ থাকার কথা না থানা কিংবা জেলা পুলিশের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের।

এই ধরণের যে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনায় আহতদের দ্রুততম সময়ে হাসপাতালে পাঠানো এবং দায় ব্যক্তিদের গ্রেফতারের ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর হওয়া ছাড়া খুব একটা ব্যথিত হওয়ার ঘটনা বিরল।

কনস্টেবল জনি খানকে ভর্তি করানোর পর কাটাহাত ফেলে দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো চিকিৎসা নেই দেশের বৃহত্তম নগরীর সর্ববৃহৎ হাসপাতাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

এ কান সে কান হয়ে এ খবরটি যখন জনি খানের কানে পৌঁছালো তখন তার আত্মচিৎকারে ভারী হয়ে ওঠলো হাসপাতালের ওয়ার্ড।

ঠিক সে সময়টাতে ফেরেস্তা হয়ে জনি খানের পাশে দাঁড়ালেন চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক। এরপর অপ্রত্যাশিতভাবেই সে সারিতে আরও দুইজন। তাদের মধ্যে একজন হলেন, বাংলাদেশ পুলিশের ডিআইজি রুহুল আমিন শিপার এবং ডা. সাজেদুর রেজা ফারুকী।

সহকর্মী কনস্টেবল জনি খানের হাত বাঁচাতে পুলিশ সুপার রশিদুল হক নিজের দায় ও দায়িত্বের সীমারেখা ভুলে যোগাযোগ করলেন ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে। যে করেই হোক সহকর্মীর দ্বিখন্ডিত হাত পূনস্থাপন যে করতেই হবে তাকে। হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতাল-মুঠোফোনে তাঁর কথা বলার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সারিটাও হয়ে ওঠলো দীর্ঘ।

তবুও হার মানার পাত্র নন এস এম রশিদুল হক। অবশেষে যোগাযোগ সম্ভব হলো, অর্থপেডিক সার্জন সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাজিদুর রেজা ফারুকীর সাথে। তার সাথে কথা বলে পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক আস্বস্থ হলেন খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে যদি আহত কনস্টেবলকে ঢাকা স্থানান্তরিত করা যায় তাহলে কাটাহাত প্রতিস্থাপন সম্ভব।

নিভুনিভু আশার প্রদীপ দপ কর জ্বলে উঠলো পুলিশ সুপারের চোখে। কিন্তু সমস্য বাদলো অন্য জায়গায়। দ্রুততম সময়ে আহত কনস্টেবলকে ঢাকা স্থানান্তরিত করতে হলে প্রয়োজন এয়ার এম্বুলেন্স কিংবা এয়ার হেলিকপ্টার। কিন্তু তাও যে নেই হতভাগা পুলিশ বাহিনীতে।

এসপি এস এম রশিদুল হক এবার সাহায্য প্রার্থী হলেন র‌্যাব ১-এর সাবেক কমান্ডার বর্তমান পুলিশের ডিআইজি রুহুল আমীন শিপার’র। সহকর্মী পুলিশ সুপারের আহ্বানে সহকর্মীকে বাঁচাতে সাহায্যের হাত বাড়ালেন তিনিও।

আহত জনি খানকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আনা, অপারেশনসহ সামগ্রীক ঘটনা নিয়ে ডিআইজি রুহুল আমীন শিপার গত ১৮ মে নিজের ফেসবুক ওয়ালে দেওয়া এক পোস্টে এমন তথ্যই জানান তিনি। ওয়ালে তিনি লিখেন,

১৫ মে। রোববার।

.. হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠলো। দেখি এসপি চট্টগ্রাম।

-হ্যালো

-স্যার, রশিদুল হক

একটা সমস্যায় পড়ে আপনাকে ফোন করেছি।

ওর কন্ঠে উদ্বেগ। বলেই চলেছে।

আসামি ধরতে গিয়ে আসামির দায়ের কোপে আমাদের এক সদস্যের হাতের কব্জি আলাদা হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের চিকিৎসকরা বলছেন দ্রুত ঢাকায় নিয়ে গেলে জোড়া লাগানো সম্ভব। আমাদের জরুরি মেডিকেল ইভাকুয়েশন দরকার। র‌্যাব এর (হেলিকপ্টার) পাইলট এর সাথে কথা হয়েছে। শুধু ওদের অপারেশন্স কে একটু বলতে হবে, স্যার।

বললাম, আমি দেখছি।

র‌্যাব এর ADG (Operations) কে ফোন দিলাম। পাওয়া গেলো না। দ্বিতীয়বার করতেই ধরলেন। আস্তে আস্তে বললেন, আমি একটা মিটিং-এ।

বললাম, We need a medevac.

-এখনি ব্যবস্থা করছি। আপনাকে ডিরেক্টর (অপস) ফোন দিবে।

একটু পরেই লে. কর্ণেল ইফতেখারের ফোন।

-স্যার, আমাদের হেলিকপ্টার রেডি আছে। আর চট্টগ্রামে কোথায় নামাবো? আমার একজন কন্টাক্ট পারসন দরকার।

বললাম,-চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামবে। আর এসপিকে যোগাযোগ করতে বলে দিচ্ছি।

তিনি আরও লিখেন, এবার ফোনে রশিদুলকে আর পাচ্ছি না। ভাবলাম, এমন পরিস্থিতিতে ও নিশ্চয়ই ব্যস্ত। এর মাঝে ডিরেক্টর (অপস্) আবার ফোন করলেন। ল্যান্ডিং ঠিক না করে হেলিকপ্টার ওড়ানো যায় না। সে মূহুর্তে প্রতিটা সেকেন্ড আমি গুণতে পারছিলাম। সে এক অন্য রকম অপেক্ষা। এমন অবস্থায় এসপি চট্টগ্রামকে এসএমএস করলাম। শেষ পর্যন্ত অবশ্য যোগাযোগ হয়ে গেল।

পোস্টের শেষ ভাগে ১৮ বিসিএস’র পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা লিখেন, সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা, জনি সুস্থ হয়ে উঠুক। ওর জোড়া লাগানো হাত আরও শক্তিশালী হোক। সেই হাতে আবার তুলে নিক হাতকড়া।

এটা শুধুমাত্র একটা জোড়া লাগানোর গল্প নয়, তার থেকেও বড় কিছু। আমরা যে আসলেই পারি।

জনি খানকে ঢাকা নেওয়ার পর মানবতার সেবকের তালিকায় যুক্ত হলেন আরও একজন নিবৃত মানবসেবক। অধ্যাপক ডা. সাজেদুর রেজা। বেসরকারি একটি হাসপাতালে টানা ১০ ঘন্টা অপারেশন করার পর জনি খানের বাঁ হাত থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া কব্জি জোড়া লাগাতে সক্ষম হন তিনি।

নিজেকে সামলে নিয়ে অসম এক পরিস্থিতিতে অসম্ভব কাজটি সফল করতে ৪৮ ঘন্টা নির্ঘুম কাটিয়েছেন পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক-এমনটাই জানালেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক বলেন, কতটা ঝুঁকি নিয়ে পুলিশের সদস্যরা কাজ করেন তার প্রমাণ জনি খান। আমি আসলে যা করেছি তা মানুষ হিসেবেই করেছি।

অন্য এক প্রশ্নের জাবাবে তিনি বলেন, রুহুল আমিন শিপার স্যার যদি এগিয়ে না আসতেন তাহলে সময়মত আহত জনিকে ঢাকা নেওয়া সম্ভব হতো না এবং অধ্যাপক ডা. সাজেদুর রেজা ফারুকী যদি এগিয়ে না আসতেন তা হলে জনির হাতের কবজি জোড়া লাগানো যেত না। ফেরেশতা যদি বলতেই হয় আমার কাছে ফেরেস্তা হলেন ডিআইজি রুহুল আমিন শিপার স্যার এবং অধ্যাপক ডা. সাজেদুর রেজা ফারুকী; যোগ করেন তিনি।

সুত্র-সিটিজি নিউজ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.