ডেস্ক রিপোর্ট
বাংলাদেশ বহুবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিলেও, নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব নিশ্চয়তা না থাকায় তা সফল হয়নি।
কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা আশ্রয়শিবিরে আবারও নতুন আলোচনার ঝড়। বছরের পর বছর অপেক্ষার পর-নতুন সরকারকে ঘিরে নতুন করে জেগেছে স্বদেশে ফেরার আশা। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আর প্রত্যাবাসন নিয়ে ভালো পরিস্থিতিতে পৌছানো যাবে বলে জানিয়েছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ রোহিঙ্গা। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আশ্রয় শিবির গড়ে উঠেছে কক্সবাজারে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যাম্প এখন উখিয়ার কুতুপালং।
বাংলাদেশ বহুবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিলেও, নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব নিশ্চয়তা না থাকায় তা সফল হয়নি। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মাঝে। তারা আশা করছেন; শিগগিরই নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে স্বদেশে ফিরতে পারবেন।
উখিয়ার ক্যাম্প-১৬ এর বাসিন্দা আসমত উল্লাহ (২৪) বলেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় আমরা নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে অনেক আশাবাদী ছিলেন। তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বর্তমানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসায় আমরা নতুন করে আশা করছি, একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি বলেন, আমরা মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে যেন সুষ্ঠুভাবে পড়াশোনা করতে পারেন এবং নাগরিকত্বের অধিকার, স্বীকৃতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত হয়-সেই ভিত্তিতেই একটি টেকসই প্রত্যাবাসন চায়। এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা করছি।
ক্যাম্প-১৮ এর বাসিন্দা আব্দুল হাই (৪৬) বলেন, ১৯৯১-৯২ সালে বিএনপি সরকার রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করেছিল। সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে আব্দুল হাই বলেন, বর্তমান সরকারও অতীতের মতো উদ্যোগ নিয়ে তাদের নিরাপত্তার সঙ্গে স্বদেশে ফেরত পাঠাবে-এমনটাই আশা করছি।
তিনি আরও বলেন, আগের মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিএনপি সরকার আবারও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
বর্ধিত ক্যাম্প-৪ এর রমিজ উদ্দিন (২২) বলেন, তিনি বলেন, আগের সরকারও বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছে-এটা আমরা স্বীকার করি। কিন্তু নানা কারণে আমরা এখনো নিজ দেশে ফিরতে পারিনি। বর্তমানে নতুন সরকার এসেছে, তাই আমরা নতুন করে আশাবাদী হয়ে অপেক্ষা করছি।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মহল ও অন্যান্য দেশ যেন বিষয়টিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখে, সে প্রত্যাশাও রয়েছে। আমাদের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যেন স্বদেশে ফিরতে পারি-এটাই আমাদের প্রধান আশা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবতা এখন আরও জটিল। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত পরিস্থিতি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলেছে। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য রাজনৈতিক ঐক্যমত্য আর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
রোহিঙ্গা বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য প্রথমেই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সামনের সারিতে, পাশে কিংবা নেপথ্যে থেকে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি দেশে এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিভিন্ন নির্বাচনী ইশতেহারে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখন দরকার একটি সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ।
তিনি মনে করেন, এই সংকট দ্রুত সমাধান হবে-এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তাই তিন, পাঁচ ও দশ বছর-এভাবে ধাপে ধাপে একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৌশল ও রোডম্যাপ প্রণয়ন করা উচিত। এতে অভ্যন্তরীণ, রাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, বিশেষ করে জাতিসংঘ ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্ভাব্য উদ্যোগগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প পরিকল্পনাও জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ, সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন অর্থায়ন উৎস খোঁজা এবং ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো। সর্বোপরি, শুধু সরকার নয়-বিরোধী দল, রাজনৈতিক শক্তি, সহযোগী সংগঠন, অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা ছাড়া এই জটিল সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন আসিফ মুনীর।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন বলছে; রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন সরকার ভালো একটি পরিস্থিতিতে পৌছাবে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও চলমান সংঘাত এখনো কোনো স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোয়নি। এ কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় একটি জটিলতা রয়ে গেছে।
তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর ধারাবাহিকতা বর্তমান সরকারও বজায় রাখবে। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা বিষয়ক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তিনি পূর্বে শুরু করা প্রক্রিয়াগুলো অব্যাহত রাখবেন বলেই বিশ্বাস করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভবিষ্যতে একটি ইতিবাচক ও গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছে মিয়ানমার থেকে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসা ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক।