কক্সবাজারে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পর্যটকরা ১২ বছরে সৈকতে ৭৭ জনের মৃত্যু ১ জন নিখোঁজ

 

মো. সেলিম উদ্দিন খাঁন

প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি, যার দীর্ঘ ১২০ কিলোমিটারের বালুকাময় সমুদ্র সৈকত, নীল জলরাশি এবং সবুজ পাহাড় বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের মন কাড়ে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গত ১২ বছরে গোসলে নেমে পানিতে ডুবে ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১,০৪৩ জন পর্যটক বা স্থানীয়কে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ও বৈরী আবহাওয়ায় সাগরের তীব্র স্রোত এবং গুপ্ত খালের কারণে সৈকত এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এদিকে- উত্তাল সাগরের তীব্র স্রোত, রিপ কারেন্ট সম্পর্কে অজ্ঞতা, পর্যটকদের অসচেতনতা এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল লাইফগার্ড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডুবে মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে। তবে আনন্দঘন ভ্রমণ অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হচ্ছে শোকের ঘটনায়। উত্তাল সাগরের তীব্র স্রোত, রিপ কারেন্ট সম্পর্কে অজ্ঞতা, পর্যটকদের অসচেতনতা এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল লাইফগার্ড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডুবে মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা।

গত ১২ বছরে সৈকতে অন্তত ৭৭ জনের মৃত্যু এবং ১ জন নিখোঁজের ঘটনায় আতঙ্কসহ ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতে মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ডের সীমিত কার্যক্রম পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই লাইফগার্ড সংখ্যা বৃদ্ধি, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম, নিরাপত্তা নির্দেশনার কার্যকর প্রচার এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।

সি সেফ লাইফগার্ড সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ডুবে মারা গেছেন অন্তত ৭৭ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ১ জন। তবে এই সময়েই লাইফগার্ডদের তৎপরতায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ৪৩ জনকে। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড। অথচ তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী এই তিনটি পয়েন্টের মাত্র দেড় কিলোমিটার এলাকায়। সুগন্ধা পয়েন্টে এক কিলোমিটার এলাকায় লাখের বেশি পর্যটকের বিপরীতে দায়িত্বে থাকেন মাত্র ৪ জন লাইফগার্ড। তাদের হাতেও নেই পর্যাপ্ত আধুনিক সরঞ্জাম, রয়েছে কেবল কয়েকটি রেসকিউ টিউব ও একটি বোট। লাইফগার্ড কর্মী মো. সেলিম জানান, প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ১০টি উদ্ধার কাজ করতে হয়, যা বর্ষা মৌসুমে বেড়ে দাঁড়ায় ১০ থেকে ১৫টিতে।

সিনিয়র লাইফগার্ড জয়নাল আবেদীন ভুট্টো বলেন, “প্রতিদিন ৫০-৬০ হাজার পর্যটকের বিপরীতে মাত্র কয়েকজন লাইফগার্ড দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। এদিকে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে লাল ও লাল-হলুদ পতাকা দিয়ে বিপদ ও নিরাপদ এলাকা চিহ্নিত করা হলেও অনেক পর্যটক তা উপেক্ষা করছেন। শুক্রবার বিকালে লঘুচাপের প্রভাবে উত্তাল সাগরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত চলাকালে মডার্ন হ্যাচারি পয়েন্টে লাইফগার্ডবিহীন এলাকায় সমুদ্রে নেমে নিখোঁজ হন মেহেরপুরের হেলাল উদ্দিন। এখনও তার কোনো খোঁজ মেলেনি।”

পর্যটক জীবন মোল্লা বলেন, নিরাপদ আর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সৈকতে এসে সরাসরি পানিতে নেমে পড়েছি। ঢাকা থেকে আসা জ্যোতি রহমান অভিযোগ করেন, হোটেলে চেক-ইনের সময়ও কোনো নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয় না। পর্যটকদের দাবি, শুধু কয়েকটি পয়েন্ট নয়, পুরো ১২০ কিলোমিটার সৈকতই লাইফগার্ড সেবার আওতায় আনা জরুরি।

পর্যটক আব্দুল গফুর বলেন, “লাইফগার্ডদের নির্দেশনা মেনে চললে দুর্ঘটনা অনেক কমে। তবে সেবা বাড়ানো জরুরি। নাছির উদ্দিন বলেন, প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে লাইফগার্ড সংখ্যা বাড়াতে হবে।”
সি সেফ লাইফগার্ডের সিনিয়র কর্মী জহিরুল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ পর্যটকদের অসচেতনতা। কোথায় নামা নিরাপদ এটা না জেনেই অনেকে পানিতে নামেন।

সংস্থার সুপারভাইজার সাইফুল্লাহ সিফাত জানান, লাল-হলুদ পতাকা মানে লাইফগার্ড তত্ত্বাবধানে নিরাপদ এলাকা। আর লাল পতাকা মানেই বিপদ, সেখানে নামা নিষেধ। সি-সেফ প্রকল্পের ফিন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন কর্মকর্তা হাফেজ আহমেদ বলেন, “১২০ কিলোমিটার সৈকতে মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে অন্তত কয়েকশ প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “উদ্ধার সরঞ্জাম বৃদ্ধি এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবার জন্য মেডিক্য়াল সাব-সেন্টার স্থাপন জরুরি।”

হোটেল খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু পতাকা টাঙিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। প্রয়োজন নিয়মিত মাইকিং, সাইনবোর্ড এবং হোটেলে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নির্দেশিকা। এসব বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “লাইফগার্ড সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।”

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.