চবি শিক্ষক সমিতির আচরণে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভ, স্বাধীনতা দিবস বয়কট ধৃষ্টতার শামিল

 

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬ মার্চ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা অনুষ্ঠানে যায়নি শিক্ষক সমিতির নেতাদের কেউ কেউ। তাদের সঙ্গে একজোট হয়ে এই অনুষ্ঠানে যাননি ডিনদের একাংশ। এটিকে নজিরবিহীন বলছে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

 

স্বাধীনতা দিবসের মত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষক সমিতি ও ডিনদের অনুপস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে চলছে সমালোচনার ঝড়। শিক্ষক সমিতি ও ডিনদের একাংশ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা আয়োজন বংকট করায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধারাও।

 

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন একটা সার্বজনীন অনুষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বর্ণাঢ্যভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কিন্তু ঠুনকো বিষয়কে সামনে এনে শিক্ষক সমিতি প্রশাসনের বিরোধীতা করতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ এমন কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি, যার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের শিক্ষক সমিতি অসম্মান জানাতে পারে। শিক্ষক সমিতি শিক্ষকদের অধিকার, দাবি-দাওয়া নিয়ে সোচ্চার হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় আয়োজন বানচালের মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পায়তারা তারা করতে পারে না।

 

মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষের কয়েক শিক্ষক ক্ষোভ জানিয়ে বলছেন, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একমাত্র অসম্মান জানানোর ধৃষ্ঠতা দেখাতে রাজাকার কিংবা তাদের সন্তানরা। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যারা এমন করতে পারে বা ইন্ধন যোগাতে পারে?

 

শিক্ষক সমিতির দাবি, এই আয়োজনে যাকে স্বাগত বক্তব্য দিতে দেওয়া হলো তিনি বিএনপি জামায়াতপন্থি। অথচ স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর নুরুল আজিম শিকদার। যিনি আওয়ামী লীগের আমলেই নিয়োগ প্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং তার গোটা পরিবারই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত।

প্রক্টর নুরুল আজিম সিকদারের এলাকা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, নুরুল আজিম সিকদারের আরেক চাচা শাহজাহান সিকদার বর্তমানে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ মনোনীত রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার মেয়র। তার চাচা আরজু সিকদার উত্তর জেলা যুবলীগের বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ সভাপতি ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবলীগের তিন দফায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

তার ভাই আল হেলাল পুতুল সিকদার রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবলীগের সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া আরেক ভাই সাজিদুল আলম সিকদার উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। নুরুল আজিম শিকদারের আরেক ভাই আল মামুন পিনু সিকদার রাঙ্গুনিয়া পৌরসভা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তার আরেক ভাই আল যায়েদ সিকদার সম্রাট বর্তমান চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

নুরুল আজিম সিকদারকে আওয়ামী পরিবারের সন্তান সে বিষয়ে দায়িত্ব নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন উত্তর জেলা যুবলীগের বর্তমান সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এস এম রাশেদুল আলম। তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি যখন নুরুল আজিম সিকদারকে শিবির বলে পোস্ট দেয় তখন আমিও মনে করেছিলাম তা সত্য। পরবর্তীতে আমি রাঙ্গুনিয়া পৌর মেয়র শাহজাহান সিকদার ও রাঙ্গুনিয়া যুবলীগের সভাপতি আরজু সিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তারা আমাকে জানালেন, নুরুল আজিম সিকদার ছাত্রজীবনের শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। পরে আমি আরও কয়েকজন থেকে জেনে নিশ্চিত হলাম, ফেসবুকে ভুল তথ্যই ছড়িয়েছে। এমন পরিবারের কারও অন্য কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

 

এদিকে স্বাধীনতা দিবসের আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইকিউএসি’র পরিচালক প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন। শিক্ষক সমিতি কয়েকজন নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুনেরও বিরোধীতা করেছেন অপ্রাসঙ্গিকভাবে। তাদের দাবি, আব্দুল্লাহ আল মামুন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে নেই। অথচ প্রফেসর মামুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি এস্যুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) পরিচালক। যেটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ। এছাড়া তিনিও আওয়ামীপন্থি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষক রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে।

 

এ দুটি ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভা ও ‍জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সম্মাননা জানানোর অনুষ্ঠান বয়কটকে শিষ্টাচার পরিপন্থি, নৈতিকতা বিবর্জিত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান বলে মনে করছে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে বলেন, আলোচনা অনুষ্ঠানে এমন একজন ব্যক্তিকে স্বাগত বক্তা হিসেবে রাখা হয়েছে যার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাণ্ড ও জামায়াত শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে৷ ওই অনুষ্ঠানে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান করা হবে। এরকম একটি অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন একজন স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা লোক। এটা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। এছাড়া অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে এমন একজনকে রাখা হয়েছে যিনি কি-না বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কোনো দপ্তরের সাথে সম্পৃক্ত না। তাই সব মিলিয়ে আমরা আলোচনা অনুষ্ঠান বয়কট করেছি। তবে আমরা সংগঠন থেকে বঙ্গবন্ধু চত্বর ও স্বাধীনতা স্মৃতি ম্যুরালে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছি।’

 

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার বলেন, ‘প্রক্টর নুরুল আজিম সিকদারের পরিবার শতভাগ মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষের এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তার পরিবার প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। আমরা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে এসব খোঁজ নিয়েছি। যারা বাইরে বাইরে অভিযোগ করছে তারা কেউই নুরুল আজিম সিকদারের অন্যকোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ দিতে পারেনি। তারা বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে দেখে এসব মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছে।’

 

প্রফেসর আব্দুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘প্রফেসর আব্দুল্লাহ আল মামুন ইউজিসি স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ আইকিউএসি’র পরিচালক। বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতা দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক তিনি। তার সভাপতিত্বে এ আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি।’

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। আমি আমার বক্তব্যে বলেছি, শিক্ষকদের মধ্যে মান-অভিমান থাকতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতা দিবস, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশ্নে শিক্ষকদের মান-অভিমান ভুলে যাওয়া উচিত ছিল। কারণ স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির মধ্যে অনৈক্য থাকলে স্বাধীনতা বিরোধীরা সুযোগ নিবে।’

 

এর আগে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালন এবং ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

 

এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে গণহত্যা দিবস স্মরণে ২৫ মার্চ সন্ধ্যা ৬:৩০টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু চত্বরে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি ও সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা। গণহত্যা দিবস উপলক্ষে ২৫ মার্চ রাত ১০:৩০ টা থেকে ১০:৩১টা পর্যন্ত ১ মিনিট সব ধরনের বাতি বন্ধ রেখে ‘ব্ল্যাক আউট’ কর্মসূচি পালন। ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাত ১২:০১ মিনিট (২৫ মার্চ দিবাগত রাতে) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভ চত্বরে বিএনসিসি কর্তৃক ট্রাম্পেট ও বিউগল বাজিয়ে স্বাধীনতা দিবসকে স্বাগত জানানো। ২৬ মার্চ সকাল ১০টায় চবি স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার এবং উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর বেনু কুমার দে কর্তৃক পুস্পস্তবক অর্পণ। অতঃপর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদসমূহের ডিন, চবি শিক্ষক সমিতি, হলসমূহের প্রভোস্ট, প্রক্টর, বিভাগীয় সভাপতি এবং ইনস্টিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালকবৃন্দ, চবি অফিসার সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব (ক্যাম্পাস ও শহর), চবি মহিলা সংসদ, সমন্বয় কর্মকর্তা বিএনসিসি, চবি ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ, চবি কর্মচারী সমিতি, চবি কর্মচারী ইউনিয়ন, চবি সাংবাদিক সমিতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, চবি এবং অন্যান্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভে পুস্পস্তবক অর্পণ।

 

পুস্পস্তবক অর্পণ শেষে চবি উপাচার্যের নেতৃত্বে চবি স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভ চত্বর থেকে শুরু হয়ে চবি বঙ্গবন্ধু চত্বরে এসে শেষ হয় একটি বড় র‌্যালি। এরপর চবি উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুস্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর চবি সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ ভবন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সংবর্ধনা।

 

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চবি উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর বেনু কুমার দে। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন চবি স্বাধীনতা দিবস উদযাপন কমিটির সভাপতি ও চবি আইকিউএসি’র পরিচালক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মামুন। আলোচনা সভায় মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার জন্য অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published.