দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার মাদার্শা ইউনিয়ের ১৫০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য বহনকারী লোকজ সংস্কৃতির গর্বের একটা অংশ মক্কারো বলী খেলা প্রতিবছর বৈশাখের ৭ তারিখ অনুষ্ঠিত হতো। বলী খেলাকে কেন্দ্র করে শিশু কিশোর, আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবার মাঝে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যেতো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটা রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও কতিপয় মহলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বের গত কয়েক বছর ধরে এই বলী খেলা বন্ধ রয়েছে। ফলে জনসাধারণ এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত। এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটা সাতকানিয়ার গর্ব এবং প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে। মক্করো পরিবার, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও প্রশাসন উদ্যোগ নিলে পুনরায় শুরু হতে পারে মক্কারো বলী খেলা।
বলী খেলা চট্টগ্রামের লোকজ সংস্কৃতির বলিষ্ঠ অনুষঙ্গ। বলী খেলা নামটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নাম। এর আভিধানিক নাম হলো মল্লযুদ্ধ বা কুস্তি প্রতিযোগিতা। বলী খেলায় চট্টগ্রামের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন কালের অর্থাৎ মধ্যযুগের। এ অঞ্চলে মল্ল নামে খ্যাত বহু প্রাচীন পরিবার দেখা যায়। অনেকে বলে থাকেন, মল্লরা মল্লামী বা যুদ্ধামি বা যুদ্ধ করার জন্য এদেশে এসেছিলেন। মধ্যযুগের কবি নওয়াজিশ খানের (১৬৩৮-১৯৬৫ খ্রি.) বর্ণনায় জানা যায়, মড়ল রাজ প্রদত্ত উপাধি ছিল। মড়ল শব্দই পরে মল্লরুপে পর্যবসিত হয়। বাঁশখালীর বকসী চামরি বলী খেলা চট্টগ্রামে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিল। এই খেলা বকসী হামিদ মল্লরের স্মৃতি বহন করে। তিনি সাতকানিয়া বাজালিয়ার টোনা ঠাকুরের মেয়েকে বিয়ে করেন। বলী খেলার উদ্ভবের ইতিকথা–সম্পর্কিত বিবরণে কবি আলাদীন আলীনূর লিখেছেন, ‘কবি কালীদাসের জন্মভূমি পশ্চিম মালব, অর্থাৎ পটিয়ার মালিয়ারা থেকে এবং কবি আফজাল আলীর জন্মভূমি পূর্ব মল্লর, অর্থাৎ সাতকানিয়ার মল্ল বা মিলুয়া থেকে প্রথম মল্লক্রীড়ার অনুষঙ্গী হিসেবে বলী খেলার উৎপত্তি হয় এবং তা সমগ্র চট্টগ্রামে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
চট্টগ্রামে সর্বমোট ২২টি মল্ল পরিবার ইতিহাস প্রসিদ্ধ। একসময় চট্টগ্রাম অঞ্চলরে প্রায় প্রতিটা গ্রামে বলী খেলার প্রচলন থাকলেও বর্তমানে উল্লখেযোগ্য দু একটি স্থান ছাড়া বাকিগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলা চলে। তবে চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকন্দ্রে লালদিঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত জব্বারের বলী খেলা এখনো আপন মহিমায় টিকে আছে। দেশের অন্যান্য স্থানের বলী খেলা কিংবা লোকজ মেলার সাথে জব্বারের বলী খেলার বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ও ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে বাঙালি যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা মাধ্যমে মনোবল বাড়ানোর উদ্দশ্যে ১৯০৯ সালে বন্দর শহর চট্টগ্রামের বদরপতি এলাকার গোলাম রসুল সওদাগরের পুত্র আবদুল জব্বার সওদাগর ১২ বৈশাখ তারিখে লালদিঘির ময়দানে সর্বপ্রথম বলী খেলার আয়োজন করেন। একসময় দেশ বিদেশের নানা বিখ্যাত বলী জব্বারের বলী খেলায় অংশগ্রহণ করছেন। এ বলী খেলা আর্কষণ করছে পাশ্চত্যকেও। ১৯৬২ সালে দুজন ফরাসী মল্লবীর আবদুল জব্বারের বলী খেলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ব্রিটিশ ফিল্ম ডিভিশন একবার ডকুমেন্টারি ফিল্ম হিসাবে আবদুল জব্বারের বলী খেলার ছবি সংগ্রহ করেছিল, যা লন্ডনের ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।
রেসলিং বর্তমান বিশ্বের অন্যতম একটি বিনোদন। রেসলিং এর বাংলা নাম কুস্তি। কুস্তি অনেক পুরাতন একটি খেলা। মধ্যপ্রাচ্যে এই খেলাটির একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। বর্তমানে অলিম্পিক সহ বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় কুস্তি একটি অন্যতম ইভেন্ট। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের মতো বাংলাদেশেও কুস্তি খেলার রয়েছে অনেক জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে এর রয়েছে বিশেষ একটি মর্যাদা।
চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার মাদার্শা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ‘মক্কারো বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা কৃতী পুরুষ সৌদি আরবের মক্কার বাসিন্দা ইয়াছিন মক্কী (রহ.) তিন শতাধিক বছর পূর্বে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সাতকানিয়ায় আসেন এবং মাদার্শার পাহাড়ি এলাকায় বসবাস শুরু করেন। এরপর থেকে এলাকাটি মক্কারো বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। অবিভক্ত মাদার্শা ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও চেয়ারম্যান ফরিদ মিয়ার পিতা কাদের বক্সু চৌধুরী বাংলাদেশের প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী বলী খেলার প্রচলন করেন। কাদের বক্সু চৌধুরীও মাদার্শা ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জমিদার ছিলেন। তিনি ইয়াছিন মক্কী (রহ.) এক প্রপৌত্র।
ইয়াছিন মক্কী এলাকায় ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি কিছু ব্যবসাও শুরু করেন। হজ মৌসুমে তিনি বাংলাদেশ থেকে অনেক হজযাত্রী সৌদি আরব নিয়ে যেতেন। এক সময় তিনি সাতকানিয়া ছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে তিনি বিপুল পরিমাণ জায়গা ক্রয় করেন। ইয়াছিন মক্কী এক হজ মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু হাজী নিয়ে সৌদি আরবে যান এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তার পরবর্তী প্রজন্ম জমিদারি প্রথা চালু করেন। পরবর্তীকালে ইয়াছিন মক্কীর প্রপৌত্র কাদের বক্সু চৌধুরী ১৮৭৯ সালে তাদের প্রজাদের থেকে খাজনা আদায়ের সময় তাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য সর্বপ্রথম বলী খেলার সূচনা করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর এটি মক্কারো বলী খেলা নামে পরিচিত লাভ করে। ইতিহাসের নিরিখে দেখা যায় মক্কারো বলী খেলা ঐতিহাসিক চট্টগ্রামের লালদীঘির জব্বারের বলী খেলার চেয়েও প্রাচীন। এই বলীখেলার শুরুর দিকে বাড়ির সামনে বিশালাকৃতির একটি গাছের টুকরো রাখতেন। খাজনা দিতে আসা এবং স্থানীয় লোকদের মধ্য থেকে যারা ওই গাছের টুকরো উপরে তুলতে পারতেন তারাই কেবল বলী খেলার উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হতেন। গাছের টুকরা ওঠানোয় যারা যোগ্যতা অর্জন করতেন তাদের মধ্যে মূল প্রতিযোগিতা বলী খেলা হতো এবং বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার দিতেন। প্রতি বছরের বৈশাখ মাসের ৭ তারিখে এই খেলার আসর বসে। বলী খেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার জায়গাজুড়ে বৈশাখী মেলারও আয়োজন করা হয়। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লোকজন বলী খেলা উপভোগ করার পাশাপাশি মেলা থেকে গৃহস্থালি ও কৃষি কাজে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নেন। কাদের বক্সুর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ফরিদ মিয়া চৌধুরী এই বলী খেলার আয়োজক ছিলেন এবং সর্বশেষ এই বলি খেলার আয়োজন কাদের বক্সুর নাতি মরহুম সাহেব মিয়ার পুত্র মাদার্শা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নাজেমুল আলম চৌধুরী।
কোন ধরনের প্রচার প্রচারণাহীন এই মক্কারো বলী খেলায় চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য লোক খেলা দেখতে ছুঁটে আসেন। বলী খেলা উপলক্ষে মক্কারো বাড়ির আশপাশে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসবে বৈশাখী মেলা। মেলার আগের দিন থেকে দোকানীরা নানা পন্যের পসরা সাজিয়ে বসেন।
মেলায় হাতপাখা, শীতল পাটি, মাটির কলস, চুড়ি ফিতা, হাতের কাঁকন, মাটির ব্যাংক, খেলনা, কুড়াল, পিড়ি, হাড়ি পাতিল, মোড়া, মাছ ধরার চাই, ঢোল, বাঁশ, বাশ ও বেতের নানা উপকরণ, নানা আসবাব ও গৃহ উপকরণ, মাটির তৈরি তৈজসপত্র, শিশুদের জন্য কাঠের পুতুল, মাটির তৈরি নানান ধরণের খেলনা সামগ্রী, ঘর সাজানোর উপকরণ প্রভৃতি গেরস্থালী উপকরণ সুলভ মুল্যে পাওয়া যায়। লোকজন বলী খেলা উপভোগের পাশাপাশি মেলা থেকে ব্যবহারের সব জিনিসপত্রও কিনে নেন। বৈশাখ মাসের ৭ তারিখে সকাল থেকে মেলায় কেনা-কাটা হলেও বলী খেলা শুরু হয় মূলত বিকালে। সমস্ত মেহমান এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বলীদের খাবারের পর দুপুর আড়াই টার দিকে মক্কার বাড়ির লোকজন হলুদ রঙের বিশাল আকৃতির ছাতা মাথায় দিয়ে বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে মাঠে প্রবেশের পর শুরু হয় বলী খেলার মূল কার্যক্রম। মক্কারো বাড়ির লোকজন মাঠে উপস্থিত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নামকরা বলীরা খালি গায়ে বাজনার তালে তালে নৃত্য করে মাঠের চার পাশে কয়েক বার ঘুরে শক্তি প্রদর্শন করে। ততক্ষণে মেলায় আসা লোকজনের মধ্য থেকে খেলায় অংশ নেয়ার আগ্রহী বলীদেরকে মাঠের মাঝখানে ডেকে নিয়ে আসে। শুরুর দিকে স্থানীয় বলীরা খেলায় অংশ নেবে এবং ধাপে ধাপে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সুঠম দেহের নামকরা বলীরা খেলা শুরু করে। বিভিন্ন সময় বলী খেলায় অংশ নিয়েছেন কক্সবাজারের রামুর দিদার বলী, উখিয়ার শমসু বলী, টেকনাফের আলম বলী, খুলনার শিপন বলী, যশোরের কামাল বলীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নামকরা বলীরা খেলায় অংশ নেন।
বলী খেলা উপলক্ষে স্থানীয় লোকজনের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করে। মক্কারো বলী খেলাকে কেন্দ্র করে মক্কারো বাড়ির আশেপাশের ঘরে ঘরে চলে উৎসবের আমেজ। প্রতিবছর বলী খেলা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা ছেলে মেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনরা সবাই বাড়িতে বেড়াতে আসে। এক সময় মাদার্শা মক্কারো বাড়ি এবং আশপাশের এলাকায় মেয়ের বিয়ের সময় বর পক্ষের সাথে অন্যান্য কথা বার্তার পাশাপাশি বলী খেলার দিন মেয়েকে নিয়ে জামাই বেড়াতে আসার কথাও পাকা করা হতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
বলী খেলাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ;
তৃতীয়পক্ষের হাতে খেলার স্বত্ব বিক্রি, দুরভিসন্ধিমূলক বলী খেলার মাঠের জায়গা মক্কারো গোষ্ঠীর বাইরের ব্যক্তির কাছে বিক্রি, ঐতিহ্যের প্রতীক মক্কারো ছাতির (ছাতা) অপব্যবহার। পারিবারিক ও গোষ্ঠিগত অনৈক্য। নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য ভুলে ক্ষমতাসীনদের অতিরিক্ত তোয়াজে স্বকীয়তা হারানো।